অর্থনীতি প্রতিবেদক
সরকারি ব্যয় সংকোচনের লক্ষ্যে প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণে নতুন কড়াকড়ি আরোপ করেছে সরকার। এখন থেকে অতিরিক্ত সচিব ও সমপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সরকারি কাজে বিদেশে যাতায়াতের ক্ষেত্রে বিমানে বিজনেস ক্লাস বা এক্সিকিউটিভ শ্রেণির পরিবর্তে বাধ্যতামূলকভাবে ইকোনমি ক্লাসে ভ্রমণ করতে হবে। বর্তমান বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে কৃচ্ছ্রসাধন নীতির অংশ হিসেবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের ব্যয় ব্যবস্থাপনা অনুবিভাগ-১ থেকে এ সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। আদেশে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, সরকারের এই নির্দেশনা অবিলম্বে কার্যকর হবে এবং পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বলবৎ থাকবে।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, স্ব-শাসিত, সংবিধিবদ্ধ এবং রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের অতিরিক্ত সচিব বা সমপর্যায়ের সকল কর্মকর্তা এই নতুন বিধিবিধানের আওতায় পড়বেন। আগে এসব কর্মকর্তারা দীর্ঘপথের আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে উচ্চতর শ্রেণির আসন ব্যবহারের সুবিধা পেতেন। নতুন নির্দেশনার ফলে এখন থেকে তারা সাধারণ যাত্রীদের মতো ইকোনমি ক্লাসেই ভ্রমণ করবেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের গত ২৯ এপ্রিল ২০২৬ তারিখের এক পত্রের পরিপ্রেক্ষিতে অর্থ বিভাগ এই প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।
ঐতিহাসিকভাবে, সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে সুযোগ-সুবিধা নির্ধারিত ছিল ২০১২ সালের ৯ অক্টোবর জারি করা একটি অফিস স্মারকের মাধ্যমে। উক্ত স্মারকের ২১(খ) অনুচ্ছেদে বৈদেশিক মুদ্রায় দৈনিক ভাতাসহ উন্নত মানের বিমান ভ্রমণের বিধান ছিল। নতুন আদেশের মাধ্যমে উক্ত বিধানে সংশোধনী এনে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের জন্য আসন ব্যবস্থার মান কমিয়ে ইকোনমি ক্লাস নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। অর্থ বিভাগের উপসচিব র. হ. ম. আলাওল কবির স্বাক্ষরিত এই আদেশে ব্যয় সাশ্রয়ের বিষয়টিকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের এই উদ্যোগের ফলে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ওপর চাপ কিছুটা কমবে। সাধারণত বিজনেস ক্লাসের টিকিটের মূল্য ইকোনমি ক্লাসের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি হয়ে থাকে। আন্তর্জাতিক রুটে বড় বহরের কর্মকর্তাদের ভ্রমণে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে ডলার সংকট মোকাবিলা এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় হ্রাসে এই নীতি ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এর আগেও বিভিন্ন সময়ে বাজেট ঘাটতি কমাতে সরকার সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণে নানা সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছিল। বিশেষ করে উন্নয়ন প্রকল্প বা অপ্রয়োজনীয় শিক্ষা সফরের ক্ষেত্রে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছিল। এবার সরাসরি বিমানের আসন শ্রেণি পরিবর্তনের মাধ্যমে স্থায়ীভাবে ব্যয় কমানোর পথ বেছে নিল প্রশাসন।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই সিদ্ধান্ত শুধুমাত্র অতিরিক্ত সচিবদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না বরং প্রশাসনিক সংস্কারের মাধ্যমে অন্যান্য স্তরেও ব্যয় সংকোচনের প্রভাব পড়বে। তবে এই আদেশ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কোনো বিশেষ ক্ষেত্র বা জরুরি প্রয়োজনে শিথিলতা থাকবে কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত কোনো তথ্য আদেশে উল্লেখ করা হয়নি। সরকারের নীতিনির্ধারকদের মতে, কৃচ্ছ্রসাধন কার্যক্রমের অংশ হিসেবে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের এই ত্যাগ তৃণমূল পর্যায়ে মিতব্যয়িতার বার্তা পৌঁছাতে সহায়ক হবে।