আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যে নিখোঁজ হওয়ার দুই সপ্তাহ পর বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থী নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির মরদেহ উদ্ধার ও আনুষ্ঠানিকভাবে শনাক্ত করেছে স্থানীয় পুলিশ। হিলসবরো কাউন্টি শেরিফ অফিস দীর্ঘ তদন্ত ও ফরেনসিক পরীক্ষার পর গত ৩০ এপ্রিল নিশ্চিত করেছে যে, উদ্ধারকৃত খণ্ডিত দেহাংশগুলোই বৃষ্টির। এই ঘটনায় জড়িত সন্দেহে তাদের রুমমেট হিশাম আবুঘরবেহকে ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে জোড়া খুনের অভিযোগ আনা হয়েছে।
তদন্তকারীদের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৬ এপ্রিল টাম্পা বে এলাকার ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার (ইউএসএফ) শিক্ষার্থী নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি ও একই বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থী জামিল আহমেদ লিমন নিখোঁজ হন। নিখোঁজের সাত দিন পর হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ব্রিজের ওপর থেকে লিমনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তবে বৃষ্টির অবস্থান সম্পর্কে পুলিশ দীর্ঘ সময় নিশ্চিত হতে পারছিল না। যদিও সন্দেহভাজন আবুঘরবেহর গাড়ির ভেতরে বৃষ্টির রক্তের দাগ পাওয়া গিয়েছিল, যা থেকে গোয়েন্দারা নিশ্চিত হন যে তিনি আর বেঁচে নেই। কিন্তু মরদেহের অবস্থান শনাক্ত করা যাচ্ছিল না।
বৃষ্টির মরদেহ উদ্ধারের প্রক্রিয়াটি ছিল বেশ জটিল। গত ২৬ এপ্রিল হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ব্রিজের দক্ষিণ দিকে অবস্থিত একটি ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলে কায়াক চালানোর সময় কয়েকজন মৎস্যজীবী একটি কালো রঙের প্লাস্টিকের ব্যাগ দেখতে পান। পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে ব্যাগটি উদ্ধার করে এবং এর ভেতরে মরদেহের খণ্ডিত অংশ খুঁজে পায়। তবে মরদেহের অবস্থা এতটাই বিকৃত ছিল যে প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে লিঙ্গ শনাক্ত করাও সম্ভব ছিল না। পরবর্তীতে আদালতে জমা দেওয়া হলফনামায় উল্লেখ করা হয়, মরদেহের খণ্ডিত অংশে থাকা পোশাকের সাথে সিসিটিভি ফুটেজে শেষবার দেখা বৃষ্টির পোশাকের হুবহু মিল রয়েছে।
হিলসবরো কাউন্টি শেরিফ চ্যাড ক্রোনিস্টার এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, মরদেহের শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত নাজুক হওয়ায় পরিচয় নিশ্চিত করতে পুলিশকে ডেন্টাল রেকর্ড এবং ডিএনএ পরীক্ষার ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। ফরেনসিক ল্যাবে দীর্ঘ পরীক্ষার পর ৩০ এপ্রিল বৃষ্টির পরিচয় নিশ্চিত করা হয়। শেরিফ আরও উল্লেখ করেন যে, অপরাধী অত্যন্ত নৃশংসভাবে মরদেহগুলো আড়াল করার চেষ্টা করেছিল। যেভাবে মানুষ মহাসড়কের পাশে আবর্জনা ফেলে রাখে, ঠিক সেভাবেই কালো পলিথিনে মোড়ানো অবস্থায় লিমন ও বৃষ্টির দেহাবশেষ পৃথক স্থানে ফেলে রাখা হয়েছিল।
এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের প্রধান অভিযুক্ত হিসেবে ২৬ বছর বয়সী মার্কিন তরুণ হিশাম আবুঘরবেহকে কোনো প্রকার জামিন ছাড়াই কারাগারে আটক রাখা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে ফার্স্ট ডিগ্রি মার্ডার বা পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের দুটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগসহ তথ্য-প্রমাণ লোপাটের একাধিক মামলা দায়ের করা হয়েছে। পুলিশের ধারণা, ব্যক্তিগত কোনো বিরোধের জেরে এই হত্যাকাণ্ড ঘটে থাকতে পারে, যা বর্তমানে অধিকতর তদন্তাধীন রয়েছে।
নিহত দুই শিক্ষার্থীর মরদেহ বাংলাদেশে পাঠানোর জন্য প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। টাম্পায় বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটি এবং ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই ঘটনায় গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। বর্তমানে পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিহতের পরিবারের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করছে এবং আইনি প্রক্রিয়া শেষে দ্রুততম সময়ে তাদের দেহাবশেষ দেশে পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই ঘটনাটি ফ্লোরিডায় বসবাসরত বিদেশি শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়েও স্থানীয় মহলে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।