অর্থনীতি প্রতিবেদক
বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার বিদ্যমান বাণিজ্য চুক্তিকে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণে সর্বোচ্চ ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন সরকারের বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, আন্তর্জাতিক যেকোনো চুক্তি পারস্পরিক সমন্বয়ের ভিত্তিতে সম্পাদিত হয় এবং সেখানে উভয় পক্ষের স্বার্থ রক্ষার বিষয়টি অন্তর্নিহিত থাকে। এই চুক্তির মাধ্যমে একটি ‘উইন-উইন’ পরিস্থিতি বা উভয় পক্ষের জন্য লাভজনক অবস্থান তৈরি করাই সরকারের লক্ষ্য।
আজ মঙ্গলবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক সহকারী বাণিজ্য প্রতিনিধি ব্রেন্ডন লিঞ্চের নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধি দলের সঙ্গে এক দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে উপস্থিত সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী সরকারের এই অবস্থানের কথা তুলে ধরেন। এ সময় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব (রুটিন দায়িত্ব) মো. আবদুর রহিম খানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার এই চুক্তির প্রাথমিক সূচনাকারী না হলেও রাষ্ট্রীয় ধারাবাহিকতা ও উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত এই আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতাকে ইতিবাচকভাবে দেখছে। তিনি উল্লেখ করেন, রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সম্পাদিত কোনো চুক্তি ব্যক্তিগত চুক্তির মতো নয় যে তা তাৎক্ষণিক বা ইচ্ছামতো বাতিল করা সম্ভব। বরং চুক্তির বিদ্যমান কাঠামোকে কাজে লাগিয়ে কীভাবে বাংলাদেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পরিধি আরও বৃদ্ধি করা যায়, সেদিকেই সরকার নজর দিচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে শুরু হওয়া একটি তদন্ত প্রক্রিয়া (ইনভেস্টিগেশন) নিয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে মন্ত্রী জানান, বাংলাদেশ ইতিমধ্যে এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা দাবি করেছে। প্রাপ্ত ব্যাখ্যার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের অবস্থান ও পর্যবেক্ষণও তাদের অবহিত করা হয়েছে। তবে বর্তমান চুক্তির প্রেক্ষাপটে এ ধরনের তদন্ত প্রক্রিয়া শুরু না হলে তা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে আরও ইতিবাচক হতো বলে তিনি মন্তব্য করেন।
বাংলাদেশের উৎপাদন ব্যবস্থা ও রফতানি খাত নিয়ে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগ খণ্ডন করে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, দেশে বর্তমানে কোনো শিল্প খাতেই ‘ওভার ক্যাপাসিটি’ বা অতিরিক্ত সক্ষমতা নেই। ডাম্পিং বা বাজারমূল্যের চেয়ে কম দামে পণ্য সরবরাহের যে অভিযোগ উঠেছে, তাকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন তিনি। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, বাংলাদেশ অধিকাংশ পণ্যই মূলত আমদানি করে থাকে। অন্যদিকে রফতানির প্রধানতম খাত তৈরি পোশাক শিল্প কঠোর আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও কমপ্লায়েন্স মেনে পরিচালিত হয়। এই খাতে শ্রম আইন লঙ্ঘন বা শিশুশ্রমের কোনো ন্যূনতম সুযোগ নেই বলে তিনি বিশ্ব সম্প্রদায়কে আশ্বস্ত করেন।
চুক্তি বাতিলের সম্ভাবনা বা জাতীয় স্বার্থ ক্ষুণ্ন হওয়ার শঙ্কা প্রসঙ্গে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে সরকার দেশের সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে সর্বদা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়। চুক্তির কোনো ধারা যদি ভবিষ্যতে বাংলাদেশের প্রতিকূলে যায়, তবে তা সংশোধনের আইনি ও কারিগরি সুযোগ চুক্তির মধ্যেই বিদ্যমান রয়েছে। একে তিনি ‘সেলফ কারেক্টিং এলিমেন্ট’ বা স্ব-সংশোধনমূলক উপাদান হিসেবে অভিহিত করেন। ফলে এ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে বা ব্যবসায়িক মহলে অতিরিক্ত উদ্বেগ বা আতঙ্কের কোনো যৌক্তিক কারণ নেই বলে তিনি অভিমত প্রকাশ করেন।
বৈঠকে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক আরও জোরালো করার পাশাপাশি শ্রম অধিকার, মেধাস্বত্ব রক্ষা এবং শুল্কায়ন প্রক্রিয়া সহজীকরণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। দুই পক্ষই ভবিষ্যতে নিয়মিত সংলাপের মাধ্যমে বিদ্যমান সমস্যা নিরসনে ঐকমত্য পোষণ করেছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই আলোচনার মধ্য দিয়ে দুই দেশের বাণিজ্যিক স্থবিরতা দূর হবে এবং বাংলাদেশের রফতানি বাজারের সক্ষমতা আরও বৃদ্ধি পাবে।