নিজস্ব প্রতিবেদক
সরকারি দপ্তরে সনাতন কাগজনির্ভর কার্যপদ্ধতি পরিহার করে দ্রুত, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন গড়ে তুলতে দেশে ই-ফাইলিং ও স্মার্ট অফিস ব্যবস্থাপনার ব্যবহার ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ডিজিটাল এই প্রশাসনিক রূপান্তরের ফলে সরকারি সেবায় সময় ও ব্যয় হ্রাসের পাশাপাশি নাগরিক সেবা প্রাপ্তি আগের তুলনায় অনেক সহজ ও কার্যকর হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ এবং এটুআই কর্মসূচির সাম্প্রতিক তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে দেশের অধিকাংশ মন্ত্রণালয়, বিভাগ, জেলা ও উপজেলা প্রশাসনসহ বিভিন্ন স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে ই-নথি বা ই-ফাইলিং কার্যক্রম পূর্ণোদ্যমে চলছে। এই প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থার ফলে সরকারি কর্মকর্তারা সশরীরে অফিসে উপস্থিত না থেকেও অনলাইনের মাধ্যমে জরুরি নথি নিষ্পত্তি, অনুমোদন ও দাপ্তরিক যোগাযোগ সম্পন্ন করতে পারছেন। এতে প্রশাসনিক স্থবিরতা দূর হওয়ার পাশাপাশি কাজের গতিশীলতা নিশ্চিত হচ্ছে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে দাপ্তরিক নথিপত্রের প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ ডিজিটাল পদ্ধতিতে সম্পন্ন হচ্ছে। এতে ফাইল নিষ্পত্তিতে সময় যেমন কমেছে, তেমনি সরকারের নীতি নির্ধারণী সিদ্ধান্তসমূহ দ্রুত বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে। আগে একটি ফাইল এক টেবিল থেকে অন্য টেবিলে স্থানান্তরের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হতো, যা বর্তমানে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে নিষ্পত্তি করা সম্ভব হচ্ছে। এই গতিশীলতা শুধু প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ দক্ষতা বাড়ায়নি, বরং দীর্ঘসূত্রতা ও অনিয়মের সুযোগও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করেছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ডিজিটাল নথি ব্যবস্থাপনার অন্যতম বড় সুবিধা হলো স্বচ্ছতা। আগে নথির নোটশিট পরিবর্তনের যে আশঙ্কা থাকত, বর্তমান ব্যবস্থায় সেই সুযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। ডিজিটাল ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে প্রতিটি ফাইলের বর্তমান অবস্থান ও অগ্রগতির ওপর নজর রাখা সম্ভব হচ্ছে। এর ফলে কোনো কর্মকর্তা ঢাকার বাইরে কিংবা বিদেশে অবস্থান করলেও ইলেকট্রনিক স্বাক্ষরের মাধ্যমে দাপ্তরিক সম্মতি প্রদান করতে পারছেন। এতে প্রশাসনিক কাজে কোনো ধরনের শূন্যতা তৈরি হচ্ছে না।
‘স্মার্ট বাংলাদেশ ২০৪১’ ভিশন বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে সরকারি অফিসগুলোকে পর্যায়ক্রমে ‘স্মার্ট অফিসে’ রূপান্তর করা হচ্ছে। এর আওতায় শুধু ই-ফাইলিং নয়, বরং ডিজিটাল নথি সংরক্ষণ, অনলাইন মিটিং, ভার্চুয়াল দাপ্তরিক যোগাযোগ, অনলাইন ছুটি ব্যবস্থাপনা এবং ডিজিটাল হাজিরা পদ্ধতিও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের তথ্যমতে, প্রতিদিন দেশজুড়ে হাজার হাজার ই-নথি নিষ্পত্তি হচ্ছে, যা কাগজ, মুদ্রণ ও পরিবহন বাবদ রাষ্ট্রের বিপুল অর্থ সাশ্রয় করছে। একই সঙ্গে কাগজের ব্যবহার হ্রাসের মাধ্যমে এই উদ্যোগ পরিবেশবান্ধব প্রশাসন গঠনেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।
মাঠ প্রশাসনের ক্ষেত্রেও ই-ফাইলিংয়ের ইতিবাচক প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ভূমি সেবা, নামজারি, বিভিন্ন লাইসেন্স নবায়ন ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির কার্যক্রমে ডিজিটাল ব্যবস্থা সংযুক্ত হওয়ায় জনগণের ভোগান্তি কমেছে। জেলা প্রশাসকদের মতে, জরুরি সরকারি নির্দেশনা দ্রুত মাঠপর্যায়ে পৌঁছানো এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে প্রযুক্তিগত এই উন্নয়ন অত্যন্ত কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সক্ষমতা বাড়াতে বর্তমানে ই-নথি ব্যবস্থাপনা ও সাইবার নিরাপত্তার ওপর বিশেষ প্রশিক্ষণও প্রদান করা হচ্ছে।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ই-ফাইলিং ব্যবস্থা শুধু প্রশাসনিক আধুনিকায়ন নয়, এটি সরকারি সেবার সংস্কৃতিতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। সেবাগ্রহীতাদের এখন আর ফাইলের খোঁজ নিতে দিনের পর দিন দপ্তরে ঘুরতে হচ্ছে না। ঘরে বসে অনলাইনে আবেদনের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হওয়ায় দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য অনেকাংশে নিরসন হয়েছে। বিশেষ করে গ্রামীণ জনপদের মানুষ ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারের মাধ্যমে দ্রুত সেবা পাওয়ায় শহর ও গ্রামের সেবাবৈষম্য দূর হচ্ছে। নারী, প্রবীণ ও কর্মজীবীদের জন্য এই পদ্ধতি সময় ও শ্রম সাশ্রয়ী হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।
তবে এই ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদী সফলতার জন্য শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, নিরবচ্ছিন্ন উচ্চগতির ইন্টারনেট সংযোগ এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। সরকার ভবিষ্যতে এই ব্যবস্থায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং উন্নত তথ্য বিশ্লেষণ প্রযুক্তি যুক্ত করার পরিকল্পনা করছে, যা সরকারি দপ্তরগুলোকে আরও বেশি নাগরিকবান্ধব ও আধুনিক হিসেবে গড়ে তুলবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। এই সামগ্রিক পরিবর্তন দেশের প্রশাসনিক কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।