অর্থ বাণিজ্য ডেস্ক
দেশের আর্থিক খাতে অনলাইন ব্যাংকিং ও মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) ক্রমবর্ধমান ব্যবহারের প্রেক্ষাপটে গ্রাহকদের সুরক্ষায় বিশেষ সতর্কবার্তা ও নির্দেশনা জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সম্প্রতি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে গ্রাহকদের অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই পদক্ষেপ নিয়েছে। গ্রাহকদের আমানত ও ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মোবাইল অ্যাপ এবং অনলাইন লেনদেনে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানানো হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এক শ্রেণির অসাধু চক্র হ্যাকিং এবং বিভিন্ন কৌশলে সাধারণ গ্রাহকদের অনলাইন ব্যাংকিং অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করে আর্থিক প্রতারণা চালাচ্ছে। এই ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে গ্রাহকদের কঠোরভাবে কিছু নিরাপত্তা নীতিমালা অনুসরণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। নির্দেশনায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, কোনো অবস্থাতেই ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নম্বর, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের পিন (PIN), পাসওয়ার্ড কিংবা ওয়ান টাইম পাসওয়ার্ড (OTP) অন্য কারো সাথে শেয়ার করা যাবে না। ব্যাংকের কোনো কর্মকর্তা বা প্রতিনিধি পরিচয়ে ফোন করলেও এই গোপনীয় তথ্যগুলো প্রদান না করার জন্য সতর্ক করা হয়েছে।
সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সময়ে ডিজিটাল জালিয়াতির অন্যতম মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে সন্দেহজনক লিংক এবং অনিরাপদ মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন। বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের নির্দেশনায় অপরিচিত বা সন্দেহজনক কোনো লিংকে ক্লিক করা এবং অজানা উৎস থেকে মোবাইল অ্যাপ ইনস্টল করা থেকে বিরত থাকতে বলেছে। বিশেষ করে অনলাইন জুয়া এবং অনিবন্ধিত বিভিন্ন ইনভেস্টমেন্ট প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে অর্থ হারানোর ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে। তাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারিত চটকদার বিজ্ঞাপন বা ভুয়া অফার থেকে সাবধান থাকতে বলা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সম্প্রতি কিছু প্রতারক চক্র বাংলাদেশ ব্যাংক, বিশ্ব ব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) মতো স্বনামধন্য আন্তর্জাতিক ও জাতীয় প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে ভুয়া লাইসেন্সবিহীন অ্যাপ বা জামানতবিহীন অনলাইন ঋণ ও বিনিয়োগের প্রস্তাব দিচ্ছে। এ ধরনের কোনো অফার বা লটারি ও পুরস্কারের প্রলোভন দেখালে তা যাচাই না করে বিশ্বাস না করতে গ্রাহকদের অনুরোধ জানানো হয়েছে। মূলত সাধারণ মানুষের সরলতার সুযোগ নিয়ে এসব অবৈধ প্রতিষ্ঠান বাজার থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করে উধাও হয়ে যাচ্ছে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি।
আর্থিক খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ডিজিটাল লেনদেনের নিরাপত্তা কেবল প্রযুক্তিগত ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে না, বরং গ্রাহকের সচেতনতা এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অপরিচিত ব্যক্তির সাথে আর্থিক লেনদেন করার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন এবং কোনো অস্বাভাবিক লেনদেনের আভাস পেলে সাথে সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কিংবা আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে অবহিত করা জরুরি। প্রয়োজনে আইনি সহায়তার জন্য নিকটস্থ থানার সাহায্য নেওয়ারও পরামর্শ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণের পথে ক্যাশলেস লেনদেন বা নগদবিহীন লেনদেন ব্যবস্থা জনপ্রিয় করা সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। তবে সাইবার অপরাধীদের তৎপরতা বাড়ায় গ্রাহক আস্থায় কিছুটা নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে। এই সংকট নিরসনে বাংলাদেশ ব্যাংক নিরলসভাবে কাজ করছে। গ্রাহকদের সুবিধার্থে এবং ব্যাংকিং ও আর্থিক সেবা নিয়ে যেকোনো ধরনের অভিযোগ বা হয়রানি দ্রুত সমাধানের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক একটি বিশেষ হেল্পলাইন নম্বর ‘১৬২৩৬’ চালু রেখেছে। কোনো গ্রাহক প্রতারণার শিকার হলে বা সন্দেহজনক কিছু লক্ষ্য করলে তাৎক্ষণিকভাবে এই নম্বরে কল করে প্রতিকার চাইতে পারবেন।
পরিশেষে, অনলাইন ব্যাংকিং ও মোবাইল অ্যাপ ব্যবহারের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত সচেতনতাই হতে পারে আর্থিক ক্ষতি প্রতিরোধের প্রধান হাতিয়ার। প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের সাথে সাথে সাইবার অপরাধের ধরনও প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে। এমতাবস্থায় কেবল নিজের অর্থ সুরক্ষিত রাখাই নয়, বরং আশেপাশের অন্যদেরও সচেতন করার মাধ্যমে একটি নিরাপদ ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব বলে মনে করে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংক আশা প্রকাশ করেছে যে, যথাযথ সতর্কতা অবলম্বনের মাধ্যমে গ্রাহকরা নিরবচ্ছিন্ন ও নিরাপদ ব্যাংকিং সুবিধা ভোগ করতে পারবেন।