নিজস্ব প্রতিবেদক
বিগত সরকারের শাসনামলে বিদ্যুৎ খাতে জমে থাকা ৪০ হাজার কোটি টাকার বিশাল অংকের বকেয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বর্তমান সরকারের অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বুধবার (২৯ এপ্রিল) রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) আয়োজিত পরামর্শক কমিটির সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ তথ্য তুলে ধরেন। দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ভবিষ্যৎ রূপরেখা নির্ধারণে আয়োজিত এই সভায় সরকারি কর্মকর্তাদের পাশাপাশি দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন।
অর্থমন্ত্রী তার বক্তব্যে জানান, পূর্ববর্তী সরকার বিদ্যুৎ খাতে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার বকেয়া রেখে গেছে, যা বর্তমান অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। এই বিশাল দায় মেটানোর পাশাপাশি জনকল্যাণমূলক ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখা সরকারের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেবল অভ্যন্তরীণ বকেয়াই নয়, বরং বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রভাবও দেশের জ্বালানি খাতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ফলে গত অর্থবছরগুলোতে জ্বালানি আমদানিতে সরকারকে অতিরিক্ত ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় করতে হয়েছে। অভ্যন্তরীণ বকেয়া এবং আন্তর্জাতিক বাজারের উচ্চমূল্য—এই দ্বিমুখী সংকটের মধ্য দিয়েই দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে এগিয়ে নিতে হচ্ছে।
দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনার ক্ষেত্রে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট করে অর্থমন্ত্রী বলেন, বর্তমান প্রশাসন পূর্ণাঙ্গভাবে মুক্তবাজার অর্থনীতির আদর্শে বিশ্বাসী। তিনি মনে করেন, কেবল সরকারি বিনিয়োগ দিয়ে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির চাকা সচল রাখা সম্ভব নয়; বরং বেসরকারি খাতের টেকসই উন্নয়নই অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হতে পারে। তাই ব্যক্তিখাতের বিকাশকে ত্বরান্বিত করতে সরকার সব ধরনের নীতিগত সহায়তা প্রদান করবে। বিশেষ করে রপ্তানি খাতে বৈচিত্র্য আনার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি জানান, তৈরি পোশাক শিল্প যেভাবে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় বিশ্ববাজারে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছে, ঠিক একইভাবে অন্যান্য সম্ভাবনাময় রপ্তানি খাতকেও সমান তালে সরকারি সুবিধা ও প্রণোদনা দেওয়া হবে। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পথ আরও সুগম হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
বিদ্যমান কর কাঠামো এবং ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন দাবির প্রেক্ষিতে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, অর্থনীতি বর্তমানে একটি কঠিন সময় পার করছে। এই পরিস্থিতিতে ঢালাওভাবে সব ক্ষেত্রে কর অব্যাহতি বা বিশেষ সুবিধা দেওয়া সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়। তবে তিনি ব্যবসায়ীদের আশ্বস্ত করে বলেন, “কর কমানোর চেয়েও জরুরি হলো ব্যবসা করার পরিবেশ সহজ করা।” ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে গিয়ে উদ্যোক্তারা যেসব প্রশাসনিক ও পদ্ধতিগত বাধার সম্মুখীন হন, সেগুলো দ্রুত অপসারণ করার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। কর প্রশাসনের স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং হয়রানি বন্ধের মাধ্যমে ব্যবসায়িক ব্যয় কমিয়ে আনাই এখন সরকারের অন্যতম লক্ষ্য।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিদ্যুৎ খাতের এই বিপুল বকেয়া দেশের ব্যাংকিং খাত এবং মুদ্রাস্ফীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলতে পারে। যদি দ্রুত এই দায় পরিশোধের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করা না হয়, তবে বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে নিরবচ্ছিন্ন সেবা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়বে। অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যে ফুটে ওঠা এই সংকটময় চিত্র ইঙ্গিত দেয় যে, আগামী বাজেটে সরকার বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের শৃঙ্খলা ফেরাতে কঠোর কোনো পদক্ষেপ নিতে পারে। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতকে অর্থনীতির মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করার বিষয়টি দেশের উদ্যোক্তা মহলে ইতিবাচক সাড়া ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মূলত স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং বকেয়া পরিশোধের কার্যকর উপায় বের করাই এখন অর্থ মন্ত্রণালয়ের সামনে প্রধান অগ্রাধিকার।