আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইরানি তেলবাহী ট্যাঙ্কার জব্দের ঘটনাকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিবাদ ও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ইরান। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ওয়াশিংটনের এই পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন এবং ‘সমুদ্রে দস্যুতা’ হিসেবে অভিহিত করেছে। সোমবার (২৭ এপ্রিল) ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকায়ি এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে এই মন্তব্য করেন।
বিবৃতিতে ইসমাইল বাকায়ি বলেন, আন্তর্জাতিক আইন ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা নীতিমালার তোয়াক্কা না করে যুক্তরাষ্ট্র যে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, তা মূলত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে অন্য দেশের সম্পদ দখলের নামান্তর। তিনি বিষয়টিকে আধুনিক জলদস্যুতা হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, আইন প্রয়োগের দোহাই দিয়ে এমন বেআইনি কর্মকাণ্ড বিশ্ববাণিজ্যের নিরাপত্তার জন্য একটি গুরুতর হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাকায়ি আরও উল্লেখ করেন যে, রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী জাহাজ ব্যবহার করে অন্য দেশের সম্পদ আটক করা আন্তর্জাতিক নীতিমালার পরিপন্থী এবং এটি বৈশ্বিক আস্থার পরিবেশকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ করছে।
ইরানি এই কর্মকর্তার মতে, সমুদ্রপথে এ ধরনের কর্মকাণ্ড কেবল দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি করে না, বরং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থার ওপর দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে সামুদ্রিক রুটে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে। তেহরান মনে করে, ওয়াশিংটনের এই একপাক্ষিক আচরণ সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন এবং আন্তর্জাতিক জলসীমায় একটি বিপজ্জনক নজির স্থাপন করছে।
ঘটনার প্রেক্ষাপটে জানা যায়, সাম্প্রতিক সময়ে পারস্য উপসাগর এবং এর সংলগ্ন আন্তর্জাতিক জলসীমায় ইরানি তেলবাহী ট্যাঙ্কার নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে বিরোধ চরম আকার ধারণ করেছে। পারমাণবিক কর্মসূচি ও অন্যান্য ইস্যুতে ইরানের ওপর আরোপিত মার্কিন নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র একাধিকবার ইরানি জাহাজ বা জ্বালানি পণ্য জব্দের পদক্ষেপ নিয়েছে। অন্যদিকে, ইরান ধারাবাহিকভাবেই এসব পদক্ষেপকে অবৈধ এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার অন্তরায় হিসেবে দাবি করে আসছে।
সামরিক ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের এই পাল্টাপাল্টি অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। ওমান সাগর ও পারস্য উপসাগরের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য পথগুলোতে এ ধরনের উত্তেজনা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীর মতো সংবেদনশীল এলাকা দিয়ে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জ্বালানি পরিবহন হওয়ায়, সেখানে যেকোনো সামরিক বা আইনি জটিলতা বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে সক্ষম।
ইরান সরকার ইতিমধ্যে স্পষ্ট করেছে যে, তারা আন্তর্জাতিক ফোরামে এই ইস্যুটি উত্থাপন করবে এবং নিজেদের সামুদ্রিক স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে প্রায়শই দাবি করা হয় যে, সন্ত্রাসবাদে অর্থায়ন এবং নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের মতো অভিযোগের ভিত্তিতেই তারা এসব পদক্ষেপ নিয়ে থাকে। দুই দেশের মধ্যকার এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটের ফলে সমুদ্রপথে যাতায়াতকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।