আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে লক্ষ্য করে সংঘটিত সাম্প্রতিক গুলির ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আকারে বিভ্রান্তিকর তথ্য ও ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ছড়িয়ে পড়েছে। গত শনিবার ওয়াশিংটন হিলটন হোটেলে আয়োজিত সাংবাদিকদের এক নৈশভোজ অনুষ্ঠানে এই হামলার ঘটনা ঘটে। রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের উদ্দেশ্যে এই ঘটনাটি ‘পরিকল্পিত নাটক’ বলে অনলাইনে যে দাবি তোলা হচ্ছে, তার কোনো তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও ফ্যাক্ট-চেকিং সংস্থাগুলো নিশ্চিত করেছে।
গত শনিবারের ওই নৈশভোজ অনুষ্ঠানে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ মার্কিন প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। হোটেলের বলরুমের বাইরে গোলাগুলি শুরু হলে নিরাপত্তার স্বার্থে দ্রুত প্রেসিডেন্টসহ অন্যান্য অতিথিদের মঞ্চ থেকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। উল্লেখ্য, গত দুই বছরের মধ্যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে লক্ষ্য করে এটি তৃতীয় দফা সম্ভাব্য হত্যাচেষ্টার ঘটনা। এই ঘটনার পরপরই বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ভুয়া তথ্যের প্রচার শুরু হয়, যা জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে।
এএফপি সহ একাধিক সংবাদ সংস্থার ফ্যাক্ট-চেক ইউনিট অনলাইনে ট্রাম্পবিরোধী বিভিন্ন অ্যাকাউন্ট থেকে ছড়ানো পোস্টগুলো বিশ্লেষণ করেছে। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, একটি ভিত্তিহীন ষড়যন্ত্র তত্ত্ব প্রচার করা হচ্ছে যে, ইরানের সাথে অজনপ্রিয় যুদ্ধসহ প্রশাসনের নেতিবাচক খবরগুলো থেকে জনদৃষ্টি ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে হোয়াইট হাউস নিজেরাই এই ঘটনা সাজিয়েছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) এই ধরনের ষড়যন্ত্রমূলক পোস্টগুলো সবচেয়ে বেশি ছড়িয়েছে।
গুজব পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ‘নিউজগার্ড’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঘটনার পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ইলন মাস্কের মালিকানাধীন প্ল্যাটফর্ম এক্সে ষড়যন্ত্রমূলক পোস্টগুলো প্রায় আট কোটি বার দেখা হয়েছে। এসব পোস্টে দাবি করা হচ্ছে যে, পেনসিলভানিয়া ও ফ্লোরিডায় ঘটে যাওয়া আগের ঘটনাগুলোর মতোই এই হামলাটিও সাজানো। তবে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কিংবা কোনো নিরপেক্ষ তদন্তেই এমন দাবির সপক্ষে কোনো প্রমাণ মেলেনি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আধুনিক যুগে বড় কোনো রাজনৈতিক সংঘাত বা হামলার পর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে এ ধরনের ‘ভুয়া তথ্য’ বা ‘মিসইনফরমেশন’ ছড়িয়ে দেওয়া একটি নিয়মিত ও উদ্বেগজনক প্রবণতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এদিকে, ওয়াশিংটনের ওই অনুষ্ঠানে গুলি চালানোর অভিযোগে ৩১ বছর বয়সী কোল টমাস অ্যালেনকে আটক করেছে পুলিশ। তার বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্টকে হত্যাচেষ্টার আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনা হয়েছে। মার্কিন আইন অনুযায়ী, এই অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হলে অভিযুক্তের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে। গত সোমবার অ্যালেনকে প্রথমবারের মতো ওয়াশিংটনের ফেডারেল আদালতে হাজির করা হয়। আদালত সূত্রে জানা গেছে, শুনানির সময় অ্যালেন নীল রঙের পোশাক পরিহিত ছিলেন এবং তার হাত পেছনে হাতকড়া দিয়ে বাঁধা ছিল।
ফেডারেল আদালতে সরকারি কৌঁসুলি জোসেলিন ব্যালান্টাইন স্পষ্ট করে বলেন যে, অভিযুক্ত কোল টমাস অ্যালেন সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হত্যার উদ্দেশ্যেই এই হামলা চালিয়েছেন। মামলার প্রাথমিক শুনানি শেষে আদালত তাকে আগামী বৃহস্পতিবার পর্যন্ত রিমান্ডে রাখার আদেশ দিয়েছেন। বর্তমানে এই ঘটনার প্রেক্ষাপটে হোয়াইট হাউস এবং প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা ব্যবস্থা পুনরায় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো খতিয়ে দেখছে যে, নিরাপত্তা বলয়ে কোনো ছিদ্র ছিল কি না যা ভেদ করে হামলাকারী হোটেলের এত কাছাকাছি পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছিল।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের আগে এ ধরনের সহিংস ঘটনা এবং পরবর্তী গুজব প্রচার মার্কিন রাজনীতিতে মেরুকরণ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। একদিকে নিরাপত্তার কড়াকড়ি নিয়ে আলোচনা চলছে, অন্যদিকে ডিজিটাল দুনিয়ায় সঠিক তথ্যের প্রবাহ নিশ্চিত করা কর্তৃপক্ষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তদন্ত কার্যক্রম চলমান থাকায় আদালত এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো সাধারণ মানুষকে ভিত্তিহীন তথ্যে বিভ্রান্ত না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। আগামী বৃহস্পতিবার রিমান্ড শেষে অভিযুক্তকে পুনরায় আদালতে হাজির করা হলে এই বিষয়ে আরও বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যেতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।