আন্তর্জাতিক ডেস্ক
বিদ্রোহী ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর নজিরবিহীন হামলার পর প্রথমবারের মতো জনসমক্ষে উপস্থিত হয়েছেন মালির অন্তর্বর্তীকালীন সামরিক নেতা কর্নেল আসসিমি গোইতা। রাজধানী বামাকোর স্পর্শকাতর সামরিক স্থাপনা ও বিমানবন্দরে বড় ধরনের নাশকতার রেশ কাটতে না কাটতেই রাশিয়ান রাষ্ট্রদূত ইগর গ্রোমাইকোর সঙ্গে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে মিলিত হন তিনি। গোইতার কার্যালয় থেকে প্রকাশিত আলোকচিত্রে দুই নেতার আলোচনার দৃশ্য দেখা গেলেও বৈঠকের বিস্তারিত এজেন্ডা নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রকাশ করা হয়নি।
গত সপ্তাহান্তে মালির প্রধান সামরিক ঘাঁটি এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বামাকো বিমানবন্দরের নিকটবর্তী এলাকায় সমন্বিত হামলা চালায় আল-কায়েদা সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠী জামাত নুসরাত আল-ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন (জেএনআইএম) এবং তুয়ারেগ বিচ্ছিন্নতাবাদীরা। গত কয়েক বছরের মধ্যে রাজধানীতে এটিই ছিল বিদ্রোহীদের সবচেয়ে বড় অনুপ্রবেশের ঘটনা। এ হামলার পরপরই দেশটির মন্ত্রিসভার একজন জ্যেষ্ঠ সদস্য নিহত হওয়ার সংবাদ আসে, যা নিরাপত্তা ব্যবস্থার নাজুকতাকে স্পষ্ট করে তোলে। সেই ঘটনার পর থেকে কর্নেল গোইতার কোনো হদিস না পাওয়ায় জনমনে ও রাজনৈতিক মহলে নানা জল্পনার সৃষ্টি হয়েছিল। এমতাবস্থায় রুশ রাষ্ট্রদূতের সাথে তার এই বৈঠকটি মূলত দেশে তার নিয়ন্ত্রণ এবং মস্কোর সাথে সুদৃঢ় সম্পর্কের বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
২০২১ সালে এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের পর থেকে আসসিমি গোইতা ফ্রান্সসহ পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে রাশিয়ার দিকে ঝুঁকে পড়েন। মালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তিনি রুশ ভাড়াটে সেনাবাহিনী ‘ওয়াগনার গ্রুপ’-এর সহায়তা গ্রহণ শুরু করেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে মালির উত্তরাঞ্চলীয় কিদাল এবং গাও শহরে সরকারি বাহিনী ও তাদের মিত্র রুশ সেনাদের ওপর বিদ্রোহীদের চাপ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। গত শনিবারের হামলার পাশাপাশি উত্তরের মরু অঞ্চলে বিদ্রোহীদের তীব্র প্রতিরোধের মুখে রুশ সমর্থিত বাহিনীকে পিছু হটতে হয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ সংস্থা নিশ্চিত করেছে।
মালির অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখন বহুমুখী সংকটের সম্মুখীন। একদিকে আল-কায়েদা ও ইসলামিক স্টেট (আইএস) সংশ্লিষ্ট সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো দেশটির মধ্যাঞ্চল ও দক্ষিণাঞ্চলে তাদের প্রভাব বিস্তার করছে, অন্যদিকে উত্তরাঞ্চলে স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে দীর্ঘ সময় ধরে লড়াই চালিয়ে আসা তুয়ারেগ বিদ্রোহীরা নতুন করে সংগঠিত হয়েছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে দেশটির সেভারে ও কিদাল অঞ্চলে তীব্র সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে, যেখানে উভয় পক্ষই ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির দাবি করছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিদ্রোহীদের হামলার পরপরই রুশ রাষ্ট্রদূতের সাথে গোইতার এই সাক্ষাৎ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এটি কেবল ব্যক্তিগত উপস্থিতির জানান দেওয়া নয়, বরং প্রতিকূল পরিস্থিতিতে রাশিয়ার সামরিক ও কূটনৈতিক সমর্থনের নিশ্চয়তা পাওয়ার একটি প্রচেষ্টা। এর আগে ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল যে, পশ্চিম আফ্রিকায় স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে তারা মালির বর্তমান প্রশাসনকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে।
তবে মালির নাগরিক সমাজ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো দেশটিতে ক্রমবর্ধমান সহিংসতা ও বেসামরিক নাগরিকদের জানমালের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। রাশিয়ার ওপর অত্যধিক নির্ভরশীলতা এবং বিদ্রোহীদের একের পর এক সফল অভিযান মালির সামরিক জান্তার সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে। ২০১২ সাল থেকে দেশটিতে চলমান এই অস্থিতিশীলতা নিরসনে কেবল সামরিক শক্তি নাকি রাজনৈতিক সমঝোতা প্রয়োজন, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে জোর বিতর্ক চলছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বামাকোসহ মালিজুড়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে এবং বিদ্রোহ দমনে নতুন কোনো সামরিক কৌশল গ্রহণ করা হয় কি না, এখন সেটিই দেখার বিষয়।