নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে ভবিষ্যতে একটি মিডিয়া কমিশন গঠনের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নৈতিক ও কারিগরি সহায়তা প্রদানের আগ্রহ প্রকাশ করেছে। সোমবার (২৭ এপ্রিল) সচিবালয়ে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ে বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেনের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ শেষে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন গণমাধ্যমকর্মীদের এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
বৈঠক শেষে তথ্যমন্ত্রী জানান, এটি একটি নিয়মিত সৌজন্য সাক্ষাৎ হলেও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ও সহযোগিতার প্রেক্ষাপটে এর গুরুত্ব অপরিসীম। নবগঠিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতের ধারাবাহিকতায় এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনায় দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহ বিশেষ করে গণমাধ্যম খাতের সংস্কার ও আধুনিকায়ন প্রাধান্য পায়।
তথ্যমন্ত্রী বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও মানবিক উন্নয়নে যুক্তরাষ্ট্রের অবদানের কথা স্মরণ করে বলেন, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে একক বৃহত্তম বাজার হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া মানবিক সহায়তার ক্ষেত্রেও দেশটি অন্যতম প্রধান অংশীদার। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে পরিবর্তিত গণমাধ্যম পরিস্থিতি মোকাবিলায় এবং একটি আধুনিক মিডিয়া ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে চায় বাংলাদেশ। বিশেষ করে পলিসি সাপোর্ট বা নীতিগত সহায়তা এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতার ক্ষেত্রে উভয় দেশ যৌথভাবে কাজ করার বিষয়ে একমত হয়েছে।
বর্তমানে বিশ্বজুড়ে গণমাধ্যম যে চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, সে বিষয়ে আলোকপাত করে মন্ত্রী জানান, প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে তাদের গণমাধ্যম খাত পরিচালনা করছে, তা বাংলাদেশের জন্য শিক্ষণীয় হতে পারে। নতুন মিডিয়া ইকোসিস্টেমের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে প্রয়োজনীয় আইনি ও কাঠামোগত সংস্কারের ক্ষেত্রে এই অভিজ্ঞতা বিনিময়ের প্রক্রিয়া কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
বৈঠকের একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে অপতথ্য (ডিসইনফরমেশন) এবং ভুয়া তথ্য (মিসইনফরমেশন) প্রতিরোধের বিষয়টি। মন্ত্রী বলেন, বর্তমান সময়ে অপতথ্য কেবল সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য নয়, বরং সাধারণ নাগরিকের জীবনের জন্যও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এক সময় প্রধান লক্ষ্য ছিল কেবল গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। তবে বর্তমানে ডিজিটাল বিপ্লবের ফলে স্বাধীনতার পাশাপাশি ‘ব্যালান্সড ফ্রিডম’ বা ভারসাম্যপূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
জহির উদ্দিন স্বপন আরও বলেন, স্বাধীনতার অপব্যবহার যাতে সাধারণ মানুষের জন্য ক্ষতির কারণ না হয়, সেদিকে সরকারকে সতর্ক থাকতে হচ্ছে। সরকারকে এখন দ্বিমুখী দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে— একদিকে গণমাধ্যমের অবাধ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং অন্যদিকে জনগণকে অপতথ্যের কুপ্রভাব থেকে রক্ষা করা। এই জটিল ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের কারিগরি অভিজ্ঞতা ও সফল মডেলগুলো পর্যালোচনার মাধ্যমে একটি কার্যকর সমাধান খোঁজার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
ভবিষ্যৎ মিডিয়া কমিশন গঠন প্রসঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, গণমাধ্যমের সামগ্রিক মানোন্নয়ন, সাংবাদিকদের পেশাদারিত্ব নিশ্চিতকরণ এবং একটি জবাবদিহিমূলক কাঠামো তৈরির লক্ষ্যেই এই কমিশন কাজ করবে। মার্কিন দূতাবাস ও তথ্য মন্ত্রণালয় এই প্রক্রিয়ায় নিবিড়ভাবে কাজ করার আগ্রহ ব্যক্ত করেছে। এই সহযোগিতার মাধ্যমে বাংলাদেশের গণমাধ্যম খাত আরও শক্তিশালী, আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন হয়ে উঠবে বলে আশা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশে স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশ যেমন সুসংহত হবে, তেমনি প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক গণমাধ্যম ব্যবস্থা গড়ে তোলাও সহজতর হবে।