আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ভবিষ্যৎ মহামারি মোকাবিলায় একটি কার্যকর আন্তর্জাতিক চুক্তির রূপরেখা চূড়ান্ত করতে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সদর দপ্তরে অতিরিক্ত এক সপ্তাহের বিশেষ আলোচনা শুরু হয়েছে। সোমবার থেকে শুরু হওয়া এই অধিবেশনে সদস্য দেশগুলো মূলত চুক্তির সবচেয়ে বিতর্কিত ও অমীমাংসিত অংশ ‘প্যাথোজেন অ্যাক্সেস অ্যান্ড বেনিফিট-শেয়ারিং’ (পিএবিএস) ব্যবস্থা নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করছে। ধনী ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে বিদ্যমান দীর্ঘদিনের মতপার্থক্য নিরসন করে একটি সর্বজনীন কাঠামো তৈরি করাই এই আলোচনার প্রধান লক্ষ্য।
২০২১ সালে কোভিড-১৯ মহামারির ভয়াবহ অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ডব্লিউএইচও সদস্য দেশগুলো একটি ঐতিহাসিক মহামারি চুক্তি গ্রহণের উদ্যোগ নেয়। দীর্ঘ তিন বছরের আলোচনার পর ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে মূল চুক্তিটি গৃহীত হলেও এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ পিএবিএস ব্যবস্থা তখন আলাদা রাখা হয়েছিল। এই ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য হলো— কোনো নতুন ভাইরাস বা জীবাণু শনাক্ত হলে তা দ্রুত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে ভাগ করে নেওয়া এবং বিনিময়ে ওই জীবাণু থেকে উদ্ভাবিত টিকা, ওষুধ ও রোগ নির্ণয় পদ্ধতির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করা।
আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা পিএবিএস ব্যবস্থা নিয়ে বিশ্বজুড়ে ভূ-রাজনৈতিক বিভাজন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোর প্রধান উদ্বেগের জায়গা হলো ‘টিকার সমবণ্টন’। কোভিড মহামারির সময় দেখা গিয়েছিল, ধনী দেশগুলো দ্রুত টিকা সংগ্রহ করতে পারলেও দরিদ্র দেশগুলো, বিশেষ করে আফ্রিকার দেশগুলো চরম সংকটে পড়েছিল। ফলে এবার উন্নয়নশীল দেশগুলো দাবি করছে, তারা যদি গবেষণার জন্য ভাইরাসের নমুনা বা জেনেটিক তথ্য সরবরাহ করে, তবে বিনিময়ে উদ্ভাবিত টিকার একটি নির্দিষ্ট অংশ বিনা মূল্যে বা সুলভ মূল্যে পাওয়ার আইনি নিশ্চয়তা থাকতে হবে।
অন্যদিকে, উন্নত দেশগুলো এবং তাদের শক্তিশালী ওষুধ শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো ভিন্ন অবস্থান নিয়েছে। তাদের মতে, বিশাল বিনিয়োগের বিপরীতে মুনাফা বা মেধাস্বত্বের সুরক্ষা না থাকলে নতুন প্রতিষেধক তৈরিতে উদ্যোক্তারা আগ্রহ হারাবে। পাশাপাশি বর্তমানে কেবল ভৌত ভাইরাস নয়, বরং ভাইরাসের জেনেটিক তথ্য (ডিজিটাল সিকুয়েন্স ইনফরমেশন) ভাগাভাগি করার বিষয়টিও আলোচনায় নতুন জটিলতা তৈরি করেছে। ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলো এই তথ্য ব্যবহারের ক্ষেত্রে কঠোর বাধ্যবাধকতার বিরোধিতা করছে।
ডব্লিউএইচও-এর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগামী ১৮ মে থেকে শুরু হতে যাওয়া ওয়ার্ল্ড হেলথ অ্যাসেম্বলিতে এই প্রস্তাবিত কাঠামোটি অনুমোদনের জন্য পেশ করার পরিকল্পনা রয়েছে। তার আগেই চলতি সপ্তাহের মধ্যে একটি খসড়া চূড়ান্ত করতে হবে। জেনেভায় নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরা জানিয়েছেন, আলোচনা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং হলেও ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ কিছু পক্ষ আগের তুলনায় কিছুটা নমনীয়তা প্রদর্শন করছে। দক্ষিণ আফ্রিকার মতো উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলো প্রযুক্তি হস্তান্তরের ওপর জোর দিচ্ছে, অন্যদিকে পাকিস্তানসহ অনেক দেশ লাইসেন্সিং ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধির দাবি জানাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই চুক্তিটি সফল হলে ভবিষ্যৎ যেকোনো বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সংকটে দেশগুলোর মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি পাবে এবং বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির অবসান ঘটবে। তবে বিনিয়োগের সুরক্ষা এবং মানবিক চাহিদার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন বিশ্ব নেতাদের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। শুক্রবার পর্যন্ত নির্ধারিত এই আলোচনা থেকে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান বেরিয়ে আসবে বলে আশা প্রকাশ করছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।