আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কাঠামোয় এক আমূল পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। দেশটির ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পরিচিত সর্বোচ্চ নেতার উত্তরসূরি মোজতবা খামেনির শারীরিক অসুস্থতা এবং বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে রাষ্ট্র পরিচালনার মূল নিয়ন্ত্রণ এখন মূলত ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কর্পস (আইআরজিসি)-এর শীর্ষ জেনারেলদের হাতে চলে গেছে। সাম্প্রতিক এক সামরিক অভিযানে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুর পর উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এই ক্ষমতার ভারসাম্য সামরিক বাহিনীর দিকে ঝুঁকে পড়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের একটি যৌথ সামরিক অভিযানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হন। ওই একই হামলায় তার পুত্র মোজতবা খামেনি গুরুতর আহত হন এবং তার পরিবারের কয়েকজন সদস্য প্রাণ হারান। এরপর থেকেই মোজতবা খামেনি জনসম্মুখ থেকে আড়ালে রয়েছেন। বর্তমানে তার শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন হওয়ায় এবং নিরাপত্তাজনিত কারণে তার সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। কেবল বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও নির্দিষ্ট চিকিৎসাকর্মীরাই তার সান্নিধ্যে যাওয়ার অনুমতি পাচ্ছেন। এমনকি দেশটির শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতারাও নতুন করে হামলার আশঙ্কায় সরাসরি সাক্ষাৎ এড়িয়ে চলছেন।
মোজতবা খামেনির শারীরিক অবস্থা নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তার একটি পায়ে কয়েক দফা জটিল অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়েছে এবং সেখানে কৃত্রিম অঙ্গ বা প্রস্থেটিক প্রতিস্থাপনের প্রক্রিয়া চলছে। এছাড়া তার একটি হাত ও মুখের অংশ বিশেষ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দগ্ধ হওয়ার কারণে স্বাভাবিকভাবে কথা বলা তার জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে, যার ফলে প্লাস্টিক সার্জারির প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। তবে শারীরিক প্রতিকূলতা সত্ত্বেও তিনি মানসিকভাবে সক্রিয় রয়েছেন বলে দাবি করা হচ্ছে। জনমনে নিজের দুর্বলতা প্রকাশ না করার কৌশল হিসেবে তিনি বর্তমানে মৌখিক বার্তার পরিবর্তে লিখিত নির্দেশনার মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো জানিয়ে দিচ্ছেন।
ইরানের বর্তমান এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত সরকারের চেয়ে সামরিক জান্তা বা আইআরজিসি-র প্রভাব বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, মোজতবা খামেনি বর্তমানে অনেকটা ‘বোর্ড অব ডিরেক্টরস’-এর চেয়ারম্যানের মতো ভূমিকা পালন করছেন, যেখানে আইআরজিসি-র জেনারেলরা নীতিনির্ধারক হিসেবে মূল সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়ন করছেন। এর ফলে ইরানের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ও তার মন্ত্রিসভার ক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়েছে। বর্তমানে তারা মূলত অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, খাদ্য ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার মতো প্রশাসনিক ও রুটিন কাজে সীমাবদ্ধ রয়েছেন।
পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রেও এই ক্ষমতার রদবদল দৃশ্যমান। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রভাব হ্রাস পেয়েছে এবং সংসদের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফের মতো ব্যক্তিত্বরা বিদেশি সম্পর্কের ক্ষেত্রে আরও বেশি প্রভাবশালী হয়ে উঠেছেন। আগে যেখানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি আলোচনা ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব দিতেন, বর্তমানে তাকে অপেক্ষাকৃত প্রান্তিক অবস্থানে দেখা যাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের রাজনৈতিক ইতিহাসে এটি একটি সন্ধিক্ষণ। একদিকে সর্বোচ্চ নেতার উত্তরাধিকার সংকট এবং অন্যদিকে সামরিক বাহিনীর ক্রমবর্ধমান আধিপত্য দেশটির ভবিষ্যৎ গতিপথকে প্রভাবিত করছে। মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে ইরানের এই অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলতে পারে। বর্তমানে দেশটির সামরিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে যে ভারসাম্য তৈরি হয়েছে, তা আপাতত স্থিতিশীল মনে হলেও দীর্ঘস্থায়ীভাবে এটি ইরানকে কোন দিকে নিয়ে যায়, সেটিই এখন বিশ্ব সম্প্রদায়ের পর্যবেক্ষণের মূল বিষয়।