আন্তর্জাতিক ডেস্ক
হরমুজ প্রণালিতে মাইন স্থাপন বা নাশকতামূলক তৎপরতায় লিপ্ত যেকোনো নৌযান দেখলেই তা গুলি করে ধ্বংস করার জন্য মার্কিন নৌবাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক পোস্টে তিনি এই কড়া হুঁশিয়ারি ব্যক্ত করেন। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই নির্দেশ মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দেওয়া ওই নির্দেশনায় বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালির কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ জলসীমায় মাইন বসাচ্ছে এমন কোনো নৌকা বা নৌযান চিহ্নিত হওয়া মাত্রই মার্কিন নৌবাহিনী তা সরাসরি লক্ষ্যবস্তু করে ডুবিয়ে দেবে। এই আদেশের ক্ষেত্রে নৌযানের আকার বা ধরণ বিবেচনায় নেওয়া হবে না। ট্রাম্প স্পষ্ট করেছেন যে, এ ধরনের উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড দমনে মার্কিন সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে কোনো প্রকার দ্বিধা বা শিথিলতা প্রদর্শন করা হবে না।
বর্তমানে এই জলপথের নিরাপত্তা পরিস্থিতি বেশ জটিল আকার ধারণ করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্টের দাবি অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালিতে আগে থেকে বিছিয়ে রাখা মাইনগুলো বর্তমানে মার্কিন মাইন অপসারণকারী জাহাজগুলো পরিষ্কারের কাজ করছে। এই কার্যক্রম চলাকালীন যেকোনো প্রকার বাধা বা নতুন করে মাইন স্থাপনের চেষ্টাকে সরাসরি সামরিক হুমকি হিসেবে বিবেচনা করছে ওয়াশিংটন।
পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের মধ্যবর্তী এই হরমুজ প্রণালি বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল। বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের এক-তৃতীয়াংশ এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়া মানেই বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেওয়া। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে এই অঞ্চলে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধ চরম আকার ধারণ করেছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই কড়া নির্দেশ এমন এক সময়ে এলো যখন পাকিস্তান ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক শক্তির মধ্যস্থতায় গত ৮ এপ্রিল থেকে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে একটি আনুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার কথা ছিল। তবে সেই সমঝোতা সত্ত্বেও মাঠপর্যায়ে পরিস্থিতির কোনো উন্নতি দেখা যাচ্ছে না। বরং যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পক্ষ থেকে একে অপরের ওপর একের পর এক পাল্টা নিষেধাজ্ঞা আরোপের ফলে সম্পর্কের আরও অবনতি ঘটেছে।
এই কূটনৈতিক টানাপোড়েনের জেরে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই প্রণালিটি বর্তমানে কার্যত বন্ধ রয়েছে। পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকায় বৈশ্বিক বাজারে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই সাম্প্রতিক হুমকি ইরানের ওপর সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের কৌশলেরই একটি অংশ। যদিও তেহরান শুরু থেকেই আন্তর্জাতিক জলসীমায় মাইন স্থাপনের অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে, তবে ওয়াশিংটন এই বিষয়ে তাদের গোয়েন্দা তথ্যের ওপর অনড় রয়েছে।
সামরিক বিশারদদের মতে, হরমুজ প্রণালির মতো সরু জলপথে ছোট নৌযানের মাধ্যমে মাইন স্থাপন করা আধুনিক নৌ-যুদ্ধের একটি অন্যতম কৌশল। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সরাসরি গুলি চালানোর নির্দেশ দেওয়ায় এখন থেকে মার্কিন নৌবাহিনী যেকোনো সন্দেহভাজন গতিবিধিকে শত্রুভাবাপন্ন হিসেবে বিবেচনা করার আইনি ভিত্তি পেল। তবে এই সিদ্ধান্তের ফলে ভুল বোঝাবুঝি বা অনিচ্ছাকৃত সংঘর্ষের ঝুঁকিও বহুগুণ বেড়ে গেছে।
এদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের এই চলমান অস্থিরতা প্রশমনে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় দীর্ঘ সময় ধরে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। যুদ্ধবিরতির শর্তগুলো পালনে সব পক্ষকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানানো হলেও ওয়াশিংটনের এই নতুন অবস্থান সেই শান্তি প্রক্রিয়াকে কতটুকু বাধাগ্রস্ত করবে, তা নিয়ে কূটনৈতিক মহলে উদ্বেগ বাড়ছে। আগামী দিনগুলোতে পারস্য উপসাগরের এই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে তেহরান কী প্রতিক্রিয়া দেখায়, তার ওপর নির্ভর করছে এই অঞ্চলের সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা।