আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় বিকল্প হিসেবে পানামা খালের ওপর বৈশ্বিক নির্ভরতা নজিরবিহীনভাবে বেড়েছে। দীর্ঘ যানজট এবং অপেক্ষার সময় এড়াতে আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলোর মধ্যে আগেভাগে যাওয়ার স্লট বুকিং করার প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। একটি দাপ্তরিক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, পাঁচ দিনের দীর্ঘ সারি এড়াতে সম্প্রতি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসবাহী (এলএনজি) একটি জাহাজ প্রায় ৪০ লাখ (৪ মিলিয়ন) মার্কিন ডলার ব্যয় করে নিলামের মাধ্যমে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পারাপারের সুযোগ কিনে নিয়েছে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে লোহিত সাগর ও মধ্যপ্রাচ্যের নৌপথগুলোতে নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় এশিয়ার জ্বালানি আমদানিকারক দেশগুলো তাদের কৌশল পরিবর্তন করেছে। পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর একক নির্ভরশীলতা কমিয়ে অনেক এশীয় ক্রেতা এখন যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলএনজি ও অন্যান্য জ্বালানি সংগ্রহ করছেন। যুক্তরাষ্ট্র থেকে এশিয়ায় পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে সুয়েজ খাল বা উত্তমাশা অন্তরীপ ব্যবহারের চেয়ে পানামা খাল ব্যবহার করা অধিক সাশ্রয়ী ও সময়সাশ্রয়ী। তবে অতিরিক্ত চাহিদার কারণে এই জলপথে এখন তীব্র যানজট পরিলক্ষিত হচ্ছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত কয়েক মাসে পানামা খাল দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৩৫ থেকে ৪০টির বেশি জাহাজ যাতায়াত করছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বেশি। সাধারণত জাহাজগুলো কয়েক মাস আগে থেকেই যাতায়াতের নির্দিষ্ট সময় বা ‘স্লট’ বুক করে রাখে। তবে বর্তমান সংকটে পূর্ব পরিকল্পনা না থাকা জাহাজগুলোর জন্য শেষ মুহূর্তের নিলামে বুকিংয়ের দাম আকাশচুম্বী হয়ে উঠেছে। আগে যেখানে একটি স্লটের গড় নিলাম দর ছিল ১ লাখ ৩০ হাজার ডলারের কাছাকাছি, চলতি বছরের মার্চ ও এপ্রিল মাসে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ লাখ ৮৫ হাজার ডলারে। বড় আকারের ট্যাঙ্কার ও এলএনজি ক্যারিয়ারের ক্ষেত্রে এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও প্রকট, যার ফলে নিলামের দর ৩০ লাখ থেকে ৪০ লাখ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার মতো নজির তৈরি হচ্ছে।
বিশ্ব সামুদ্রিক বাণিজ্যের প্রায় ৫ শতাংশ পানামা খালের ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে আটলান্টিক মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরের সংযোগ রক্ষাকারী এই পথটি এখন যুক্তরাষ্ট্র ও এশিয়ার বাজার সংযোগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। পানামা খাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, খালের পানির স্তর বজায় রাখা এবং সুষ্ঠুভাবে জাহাজ পরিচালনার জন্য তারা আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, তবে চাহিদার তুলনায় স্লটের সংখ্যা সীমিত হওয়ায় নিলামে উচ্চমূল্য নির্ধারণ হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে এবং হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতা বজায় থাকলে বিশ্ব বাণিজ্যে সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখতে পানামা খালের গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পাবে। উচ্চ ব্যয় সত্ত্বেও সময় বাঁচাতে বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো এই পথকেই প্রাধান্য দিচ্ছে, যার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের পরিবহন খরচ ও জ্বালানি মূল্যের ওপর পড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাণিজ্য পরিস্থিতিতে এই খালের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বিকল্প নৌপথের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।