আন্তর্জাতিক ডেস্ক
পারস্য উপসাগরের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালীতে ইরানি বাহিনীর হাতে বাণিজ্যিক জাহাজ আটকের ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে ব্যাপক ঊর্ধ্বগতি পরিলক্ষিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম এক লাফে কয়েক শতাংশ বৃদ্ধি পায়। বাজার সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ায় তেলের বাজার এই অস্থিরতার মুখে পড়েছে।
সর্বশেষ বাজারদর অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে ১০৩ ডলার বা প্রায় ৭৬ দশমিক ৩৫ পাউন্ডে উন্নীত হয়েছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে তেলের দর ব্যারেল প্রতি ৯৪ ডলার অতিক্রম করেছে। গত কয়েক মাসের মধ্যে তেলের এই মূল্যবৃদ্ধিকে অন্যতম সর্বোচ্চ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। সাধারণত এই ধরনের সামরিক উত্তেজনা সৃষ্টি হলে সরবরাহ চেইন বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় আমদানিকারক দেশগুলো আগাম মজুত বৃদ্ধি করে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে মূল্যের ওপর।
ঘটনার বিবরণে জানা গেছে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাওয়ার সময় তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজ ইরানি বাহিনীর বাধার মুখে পড়ে। এর মধ্যে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) দুটি জাহাজকে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে জব্দ করেছে বলে দাবি করেছে। তবে এই ঘটনার পরপরই পাল্টাপাল্টি অভিযোগ ও উত্তেজনার পারদ চড়তে শুরু করে। পারস্য উপসাগরের এই সংকীর্ণ জলপথটি বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেল পরিবহনের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল। বিশ্বের মোট উৎপাদিত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এখানে যেকোনো ধরণের অস্থিরতা সরাসরি বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, তেলের এই মূল্যবৃদ্ধির প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিল গত মঙ্গলবার থেকেই। তৎকালীন মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইরানের পারমাণবিক চুক্তি সংক্রান্ত কিছু কঠোর অবস্থান এবং পরবর্তীতে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ সংক্রান্ত ঘোষণা আসার পর থেকেই বাজার অস্থির হতে শুরু করে। এরপর সরাসরি জাহাজ জব্দের খবরটি আগুনে ঘি ঢালার মতো কাজ করেছে। বিশেষ করে জ্বালানি আমদানিকারক দেশগুলোর জন্য এই মূল্যবৃদ্ধি বড় ধরনের আর্থিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভৌগোলিক ও কৌশলগত কারণে হরমুজ প্রণালী ইরান এবং পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধের কেন্দ্রবিন্দু। ওমান ও ইরানের মধ্যবর্তী এই জলপথটি দিয়ে সৌদি আরব, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং কুয়েতের মতো বড় তেল রপ্তানিকারক দেশগুলো তাদের পণ্য পাঠায়। এর আগেও একাধিকবার ইরান ও পশ্চিমাদের মধ্যে উত্তেজনার জেরে এই পথে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটেছে এবং প্রতিবারই বিশ্ববাজারে তেলের দামে এর নেতিবাচক প্রতিফলন দেখা গেছে।
অর্থনীতিবিদরা আশঙ্কা করছেন, যদি এই উত্তেজনা প্রশমিত না হয় এবং জাহাজ চলাচলে অনিশ্চয়তা বজায় থাকে, তবে তেলের দাম আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তেলের দাম বাড়লে আন্তর্জাতিক পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি উন্নয়নশীল দেশগুলোতে মুদ্রাস্ফীতি চরমে পৌঁছাতে পারে। বর্তমান পরিস্থিতিতে ইউরোপ ও এশিয়ার প্রধান বাজারগুলো পরিস্থিতির ওপর গভীর পর্যবেক্ষণ চালাচ্ছে। আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থা (আইইএ) এবং ওপেকভুক্ত দেশগুলোর পরবর্তী পদক্ষেপের দিকেও তাকিয়ে আছে বিশ্ববাজার। এই সংকটের কূটনৈতিক সমাধান না হওয়া পর্যন্ত জ্বালানি খাতের এই অস্থিরতা কাটবে না বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।