আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান উত্তেজনা এবং আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বিশ্ব বর্তমানে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জ্বালানি নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়েছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) প্রধান ফাতিহ বিরোল সতর্কবার্তা উচ্চারণ করে জানিয়েছেন, বর্তমান এই সংকট ১৯৭০-এর দশকের তেল সংকটকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেলের ক্রমবর্ধমান মূল্য এবং সরবরাহ ব্যবস্থার অনিশ্চয়তা বিশ্ব অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফাতিহ বিরোল সম্প্রতি জ্বালানি সংকটের বর্তমান গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের প্রবাহকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। ইরান কেন্দ্রিক ভূ-রাজনৈতিক সংকটের প্রভাবে এরই মধ্যে বিশ্ববাজার থেকে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ ব্যারেল তেল অপসারিত হয়েছে। এই বিশাল পরিমাণ ঘাটতি মেটানো বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজার ও সরবরাহকারীদের জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আইইএ প্রধানের মতে, বিশ্ব বর্তমানে যে পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তা কেবল সাময়িক কোনো মূল্যবৃদ্ধি নয়; বরং এটি একটি গভীর কাঠামোগত সংকট। ১৯৭৩ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ পরবর্তী তেলের যে সংকট বিশ্ব দেখেছিল, বর্তমান প্রেক্ষাপট তার চেয়েও জটিল ও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। তিনি মনে করেন, ক্রমবর্ধমান মূল্যের কারণে বৈশ্বিক চাহিদার ওপর একটি প্রবল নিম্নমুখী চাপ তৈরি হবে। অর্থাৎ, উচ্চমূল্যের কারণে সাধারণ গ্রাহক ও শিল্পোন্নত দেশগুলো তাদের জ্বালানি ব্যবহারের মাত্রা কমিয়ে আনতে বাধ্য হবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের মাত্রা বৃদ্ধি পেলে পারস্য উপসাগরের মতো গুরুত্বপূর্ণ তেল সরবরাহ রুটগুলো বন্ধ বা সীমিত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। হরমুজ প্রণালীর মতো স্পর্শকাতর জলপথ দিয়ে বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের একটি বড় অংশ পরিবাহিত হয়। এই অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা বাড়লে বিশ্ব সরবরাহ ব্যবস্থা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যার ফলে জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী হয়ে ওঠে। ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামের অস্থিতিশীলতা উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে।
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বিভিন্ন দেশের সরকারগুলো বর্তমানে নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। তবে ফাতিহ বিরোল সতর্ক করেছেন যে, সরকারগুলো ভবিষ্যতে যেসব কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারে, তার ফলেও জ্বালানির চাহিদায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। অনেক দেশ নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝোঁকার চেষ্টা করলেও তাৎক্ষণিকভাবে খনিজ তেলের বিকল্প খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।
এই সংকটের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব সম্পর্কে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জ্বালানির উচ্চমূল্য কেবল পরিবহন বা বিদ্যুৎ খাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না, এটি খাদ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে দৈনন্দিন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামকেও প্রভাবিত করে। ফলে বিশ্বজুড়ে মুদ্রাস্ফীতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। বিশেষ করে যেসব দেশ আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল, তাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে বড় ধরনের টান পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আইইএ-র এই সতর্কতা বিশ্ব নেতাদের জন্য একটি কড়া বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি রক্ষা এবং জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদার না হলে বিশ্ব অর্থনীতি এক গভীর মন্দার মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আগামী দিনগুলোতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সম্পর্ক এবং মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক পরিস্থিতিই নির্ধারণ করবে বিশ্ব জ্বালানি বাজারের ভবিষ্যৎ গতিপথ।