আন্তর্জাতিক ডেস্ক
এশিয়ার বিভিন্ন দেশের জলসীমা থেকে ইরানের অন্তত তিনটি তেলবাহী তেলবাহী ট্যাংকার জব্দ করেছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। ভারত, মালয়েশিয়া ও শ্রীলঙ্কার উপকূলের কাছ থেকে এই জাহাজগুলো জব্দ করে বর্তমানে নির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপের ফলে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সামরিক ও রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও চরম রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।
শিপিং ও নিরাপত্তা সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ওয়াশিংটন কর্তৃক সমুদ্রপথে তেহরানের বাণিজ্যের ওপর কঠোর অবরোধ আরোপ করার পর এই অভিযান পরিচালনা করা হলো। মূলত হরমুজ প্রণালী ও ইরানের বিভিন্ন বন্দরে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণে মার্কিন কড়াকড়ি শুরুর অংশ হিসেবে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ করতে তেহরান তিনটি জাহাজে গুলিবর্ষণ করার পর পাল্টাপাল্টি এই অভিযান শুরু হয়।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে ইরানের প্রত্যক্ষ সংঘাত শুরু হওয়ার প্রায় দুই মাস অতিবাহিত হলেও বর্তমানে দু’পক্ষের মধ্যে শান্তি আলোচনার কোনো কার্যকর লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। এর বদলে সমুদ্রপথে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লড়াই তীব্রতর হচ্ছে। মার্কিন ও ভারতীয় শিপিং সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে, জব্দ করা তিনটি ইরানি ট্যাংকারের মধ্যে ‘ডিপ সি’ নামক একটি সুপারট্যাংকার রয়েছে, যা এক সপ্তাহ আগে মালয়েশিয়া উপকূল থেকে নিখোঁজ হয়েছিল। এছাড়া ‘সেভিন’ ও ‘ডোরেনা’ নামক আরও দুটি বড় আকারের ট্যাংকার জব্দ করা হয়েছে। এর মধ্যে ডোরেনা নামক ট্যাংকারটি প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল নিয়ে ভারত উপকূলের কাছাকাছি অবস্থান করছিল।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ইরানি বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত অবরোধ অমান্য করার চেষ্টা করায় ‘ডোরেনা’ বর্তমানে একটি মার্কিন রণতরীর পাহারায় ভারত মহাসাগরে অবস্থান করছে। সেন্টকম আরও উল্লেখ করেছে যে, সমুদ্রপথে অবরোধ শুরু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ২৯টি জাহাজকে তারা পুনরায় বন্দরে ফিরে যেতে বাধ্য করেছে। উন্মুক্ত সাগরে ইরানের সামরিক তৎপরতা এবং ভাসমান মাইনের ঝুঁকি এড়াতে মার্কিন বাহিনী এখন আন্তর্জাতিক জলসীমায় ইরানি জাহাজগুলোকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী লক্ষ্যবস্তু করছে।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের এই উত্তেজনা কেবল সামরিক সংঘাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এর প্রভাব পড়ছে বিশ্ব অর্থনীতিতে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের মোট উৎপাদিত তেল ও গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ সরবরাহ করা হয়। বর্তমান উত্তেজনার কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ রুটটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। গত কয়েক দিনে মার্কিন বাহিনী ইরানের একটি কার্গো জাহাজ এবং একটি তেলবাহী ট্যাংকার জব্দ করার প্রতিক্রিয়ায় ইরানও পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। তেহরান জানিয়েছে, বুধবার হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করার সময় তারা দুটি কন্টেইনার জাহাজ জব্দ করেছে। সংঘাত শুরু হওয়ার পর এটিই ছিল ইরানের পক্ষ থেকে প্রথম জাহাজ জব্দের ঘটনা।
বিশ্লেষকদের মতে, সমুদ্রপথে এই পাল্টাপাল্টি জাহাজ জব্দের ঘটনা এশিয়ায় জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে ভারত ও শ্রীলঙ্কার মতো দেশগুলোর কাছাকাছি জলসীমায় এ ধরনের সামরিক তৎপরতা দক্ষিণ এশিয়ার সামুদ্রিক নিরাপত্তার জন্যও নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক নৌ-সংস্থাগুলো এই রুট দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে। তবে ওয়াশিংটন বা তেহরান—কোনো পক্ষই এখন পর্যন্ত নমনীয় হওয়ার সংকেত না দেওয়ায় এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।