আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক প্রভাব এবং নৌ চলাচলসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ দফার আলোচনা কোনো চুক্তি ছাড়াই শেষ হয়েছে। পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত এই দীর্ঘ বৈঠকটি প্রায় ২০ ঘণ্টা চলার পর ভেঙে যায়। আলোচনায় অগ্রগতি না হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যে চলমান কূটনৈতিক অনিশ্চয়তা আরও ঘনীভূত হয়েছে এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা বৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানিয়েছেন, আলোচনায় সমঝোতা না হলেও কূটনৈতিক পথ এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে সংলাপের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না, তবে নতুন দফা আলোচনার সময়সূচি এখনো নির্ধারণ করা হয়নি। ইরানি পক্ষের এই মন্তব্যে বোঝা যায়, উভয় দেশই আনুষ্ঠানিকভাবে যোগাযোগ বন্ধ না রেখে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের অবস্থানে রয়েছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, ইরানের বন্দর ব্যবহারকারী জাহাজগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা শুরু হয়েছে। এই পদক্ষেপের ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহন ব্যবস্থায় নতুন চাপ সৃষ্টি হতে পারে বলে পর্যবেক্ষকদের ধারণা। বিশেষ করে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা এবং বীমা ব্যয় বৃদ্ধির ঝুঁকি দেখা দিতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, আলোচনার ব্যর্থতার পেছনে মূলত তিনটি ইস্যুতে গভীর মতবিরোধ কাজ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ, মধ্যপ্রাচ্যে দেশটির রাজনৈতিক ও সামরিক প্রভাব এবং হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও নৌ চলাচল নিরাপত্তা। এসব বিষয় দীর্ঘদিন ধরেই দুই দেশের সম্পর্কের কেন্দ্রীয় বিরোধের জায়গা হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ২০১৫ সালের ঐতিহাসিক চুক্তি (জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন) থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরে আসার পর থেকেই দুই দেশের মধ্যে আস্থার সংকট তীব্র হয়। এরপর একাধিক দফায় আলোচনা হলেও স্থায়ী কোনো সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। সাম্প্রতিক আলোচনাও সেই ধারাবাহিক অচলাবস্থারই অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মার্কিন বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামনে দুটি প্রধান কৌশলগত পথ খোলা রয়েছে—একটি হলো অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ বৃদ্ধি করা, যার মধ্যে নতুন নিষেধাজ্ঞা ও নৌ চলাচলে নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপ অন্তর্ভুক্ত; অন্যটি হলো সীমিত পরিসরে কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রাখা, যাতে পরিস্থিতি আরও অবনতি না ঘটে। তবে কোন পথ গ্রহণ করা হবে, তা নির্ভর করছে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও আঞ্চলিক পরিস্থিতির ওপর।
এদিকে নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আলোচনা বন্ধ থাকলে সামরিক উত্তেজনার ঝুঁকি বাড়তে পারে। বর্তমানে বিদ্যমান দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ২১ এপ্রিল শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। এই সময়সীমার মধ্যে নতুন কোনো কূটনৈতিক উদ্যোগ না এলে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। পাকিস্তানসহ কয়েকটি দেশ মধ্যস্থতার মাধ্যমে নতুন আলোচনার পরিবেশ তৈরি করতে পারে বলেও কূটনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে।
হরমুজ প্রণালি এই সংকটের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশ্বের মোট তেল পরিবহনের একটি বড় অংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিচালিত হয়। ফলে এখানে যেকোনো ধরনের অস্থিরতা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে এ অঞ্চলটির নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে মতপার্থক্য বিদ্যমান রয়েছে, যা সাম্প্রতিক আলোচনায়ও অমীমাংসিত থেকে গেছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, কূটনৈতিক উদ্যোগ অব্যাহত না থাকলে আঞ্চলিক অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে এবং এর প্রভাব বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও পড়তে পারে।