আন্তর্জাতিক ডেস্ক
কানাডার ফেডারেল পার্লামেন্টে সাম্প্রতিক উপনির্বাচনে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কানাডীয় নাগরিক ডলি বেগম টরোন্টোর স্কারবোরো সাউথওয়েস্ট আসন থেকে লিবারেল পার্টির প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। স্থানীয় সময় সোমবার (১৩ এপ্রিল) অনুষ্ঠিত তিনটি ফেডারেল উপনির্বাচনের ফলাফলে এই জয় নিশ্চিত হয়। এই ফলাফলের মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির নেতৃত্বাধীন লিবারেল পার্টি কানাডার হাউস অব কমন্সে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হচ্ছে।
কানাডায় একযোগে অনুষ্ঠিত এসব উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় অন্টারিও প্রদেশের ইউনিভার্সিটি–রোসডেল ও স্কারবোরো সাউথওয়েস্ট এবং কুইবেক প্রদেশের তেরেবোন আসনে। স্থানীয় সময় সোমবার ভোটগ্রহণ শেষে প্রকাশিত ফলাফলে স্কারবোরো সাউথওয়েস্ট আসনে ডলি বেগম বিজয়ী হন। বাকি আসনগুলোর ফলও ক্ষমতাসীন লিবারেল পার্টির রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করেছে বলে দেশটির রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের অভিমত।
এই উপনির্বাচনকে কানাডার বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ, সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে লিবারেল পার্টির জন্য একটি আসনের প্রয়োজন ছিল বলে রাজনৈতিক সমীকরণে উল্লেখ করা হয়। উপনির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর দলটির আসনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে ১৭৪-এ দাঁড়িয়েছে বলে বিভিন্ন রাজনৈতিক সূত্রে জানা গেছে। এর আগে দলটির আসনসংখ্যা ছিল ১৭১। ফলে সংসদে সরকারের আইন প্রণয়ন ও নীতি বাস্তবায়নের সক্ষমতা আরও সুদৃঢ় হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের ফলে প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির নেতৃত্বাধীন সরকারের জন্য আইন পাস এবং নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়া তুলনামূলকভাবে সহজ হবে। এতে করে সরকারের স্থিতিশীলতা বাড়বে এবং নির্ধারিত ২০২৯ সালের সাধারণ নির্বাচন পর্যন্ত প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনায় রাজনৈতিক চাপ কিছুটা কমবে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।
ডলি বেগম এর আগে অন্টারিও প্রাদেশিক রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। তিনি ২০১৮ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে প্রথমবার এবং পরবর্তীতে ২০২২ সালে পুনরায় অন্টারিও প্রাদেশিক পার্লামেন্টের সদস্য (এমপিপি) হিসেবে নির্বাচিত হন। চলতি বছরের নির্বাচনে তিনি টরোন্টোর স্কারবোরো সাউথওয়েস্ট আসন থেকে নিউ ডেমোক্রেটিক পার্টির (এনডিপি) প্রার্থী হিসেবে জয়ী হয়েছিলেন এবং পরবর্তীতে দল পরিবর্তন করে লিবারেল পার্টিতে যোগ দেন।
কানাডার তিন স্তরের সরকার ব্যবস্থার প্রেক্ষাপটে ডলি বেগম প্রথম বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত রাজনীতিক হিসেবে নিউ ডেমোক্রেটিক পার্টির হয়ে আইনসভায় প্রতিনিধিত্ব করেন। তার রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও স্থানীয় পর্যায়ে দীর্ঘদিনের সম্পৃক্ততা তাকে ফেডারেল পর্যায়ের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে এসেছে বলে পর্যবেক্ষকদের মত।
উপনির্বাচনে মনোনয়ন পাওয়ার আগে স্কারবোরো সাউথওয়েস্ট আসনটি দীর্ঘদিন লিবারেল পার্টির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল। সাবেক মন্ত্রী বিল ব্লেয়ারের পদত্যাগের পর আসনটি শূন্য হলে দলটি বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এই প্রার্থীকে মনোনয়ন দেয়। প্রচারণার সময় ডলি বেগম স্থানীয় কমিউনিটির জীবনযাত্রার ব্যয়, আবাসন সংকট এবং সামাজিক সেবার উন্নয়নকে প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরেন।
তিনি তার এক বিবৃতিতে বলেন, তিনি দীর্ঘদিন ধরে স্কারবোরো সাউথওয়েস্টের মানুষের জন্য কাজ করে আসছেন এবং বর্তমান সময়ে দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় পর্যায়ে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখার লক্ষ্যেই ফেডারেল রাজনীতিতে অংশ নিচ্ছেন। জীবনযাত্রার ব্যয় হ্রাস, সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিতকরণ এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জনকে তিনি তার রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের অংশ হিসেবে উল্লেখ করেন।
ডলি বেগমের এই বিজয়ের পর প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি তাকে অভিনন্দন জানান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বার্তায় তিনি বলেন, ডলি বেগমের জয় তার দীর্ঘদিনের নেতৃত্ব, জনসেবার প্রতি প্রতিশ্রুতি এবং কমিউনিটির উন্নয়নে অবদানের স্বীকৃতি। তিনি আরও উল্লেখ করেন, ডলি বেগমের অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্ব কানাডার ভবিষ্যৎ নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
উল্লেখ্য, ডলি বেগমের পরিবার বাংলাদেশের মৌলভীবাজার জেলার মনু নদের পাড়ের বাসিন্দা। শৈশবে তিনি ১২ বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে কানাডায় অভিবাসী হন। পরবর্তীতে তিনি টরোন্টো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন এবং লন্ডনের ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন (ইউসিএল) থেকে উন্নয়ন প্রশাসন ও পরিকল্পনায় স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন।