আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলমান শান্তি আলোচনা কোনো কার্যকর অগ্রগতি ছাড়াই শেষ হওয়ায় এবং হরমুজ প্রণালীতে সামুদ্রিক চলাচল নিয়ে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে সোমবার (১৩ এপ্রিল) লেনদেন শুরুর পরপরই বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ মার্কিন ডলারের সীমা অতিক্রম করে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক শেয়ারবাজার ও মুদ্রাবাজারেও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।
বাজার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, লেনদেন শুরুর কিছুক্ষণের মধ্যেই মে মাসের সরবরাহের জন্য মার্কিন বেঞ্চমার্ক ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৪ দশমিক ৫০ ডলারে পৌঁছে। একই সময়ে আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের জুন মাসের সরবরাহ মূল্য প্রায় ৭ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০২ ডলারে দাঁড়ায়। এর আগে যুদ্ধবিরতির প্রেক্ষাপটে গত সপ্তাহে তেলের দাম কিছুটা কমে গিয়েছিল, তবে সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে সেই প্রবণতা উল্টে যায়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা এবং গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ হরমুজ প্রণালী ঘিরে অনিশ্চয়তা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খলে চাপ সৃষ্টি করছে। এই প্রণালী দিয়ে বিশ্বের একটি বড় অংশের তেল পরিবহন হয়ে থাকে, ফলে এখানে যেকোনো ধরনের বাধা বৈশ্বিক বাজারে দ্রুত প্রভাব ফেলে।
এদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষ থেকে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি ও শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর হরমুজ প্রণালীতে সামুদ্রিক অবরোধ আরোপের হুঁশিয়ারি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। সংশ্লিষ্ট ঘোষণায় বলা হয়েছে, দুই সপ্তাহের ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির পর উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় নতুন সংকট তৈরি করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড জানায়, সোমবার সকাল ১০টা (ইস্টার্ন টাইম) থেকে, যা পাকিস্তান স্ট্যান্ডার্ড টাইম অনুযায়ী সন্ধ্যা ৭টা, ইরানের বন্দরগুলোতে প্রবেশ ও প্রস্থানকারী সব ধরনের সামুদ্রিক যান চলাচলের ওপর নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা কার্যকর করা শুরু হয়েছে। এই পদক্ষেপের ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহন ব্যবস্থায় প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
জ্বালানি বাজারের পাশাপাশি বৈশ্বিক শেয়ারবাজারেও এর প্রভাব পড়েছে। এশিয়ার লেনদেন শুরুর সময় দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধান সূচক কোসপি এক পর্যায়ে প্রায় ২ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেলেও পরবর্তীতে কিছুটা পুনরুদ্ধার করে। একই সময়ে জাপানের প্রধান শেয়ার সূচক নিক্কেই ০ দশমিক ৩ শতাংশ কমে লেনদেন শেষ করে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ঝুঁকি-ভীতিকর বিনিয়োগ প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ায় বিনিয়োগকারীরা শেয়ারবাজার থেকে কিছুটা সরে যাচ্ছেন।
মুদ্রাবাজারেও ডলারের শক্ত অবস্থান লক্ষ্য করা গেছে। মার্কিন ডলার সূচক, যা ছয়টি প্রধান মুদ্রার বিপরীতে ডলারের মান নির্ধারণ করে, তা শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে ৯৯ দশমিক ১৮৭-এ পৌঁছায়, যা গত ৭ এপ্রিলের পর সর্বোচ্চ। এর ফলে ইউরো, ব্রিটিশ পাউন্ড, অস্ট্রেলিয়ান ডলার ও নিউজিল্যান্ড ডলারের মতো প্রধান মুদ্রাগুলোর মান কমে যায়।
বাজার তথ্য অনুযায়ী, ইউরোর দর ০ দশমিক ৫ শতাংশ কমে ১ দশমিক ১৬৬৭ ডলারে, ব্রিটিশ পাউন্ড ০ দশমিক ৬ শতাংশ কমে ১ দশমিক ৩৩৮৩ ডলারে, অস্ট্রেলিয়ান ডলার ০ দশমিক ৮ শতাংশ কমে ০ দশমিক ৭০১৪ ডলারে এবং নিউজিল্যান্ড ডলার ০ দশমিক ৭ শতাংশ কমে ০ দশমিক ৫৭৯৮ ডলারে নেমে এসেছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি এবং গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথে অনিশ্চয়তা বৈশ্বিক বাজারে ঝুঁকি-বিমুখ প্রবণতা তৈরি করেছে। ফলে বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ সম্পদ হিসেবে ডলারের দিকে ঝুঁকছেন, যা মার্কিন মুদ্রার শক্তিশালী অবস্থানকে আরও জোরদার করেছে।
বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান ওয়েস্টপ্যাকের এক নোটে বলা হয়েছে, ফরেক্স বাজারে সীমিত লেনদেনের মধ্যেও ঝুঁকি-বিমুখ মনোভাব স্পষ্ট, যার প্রভাবে ডলারের শক্তিশালী উত্থান দেখা গেছে। বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এই অস্থিরতা অব্যাহত থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।