সুস্থ মানুষেরও হঠাৎ হার্ট অ্যাটাক হতে পারে
কিছুদিন আগে এক দুপুরে চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউজে কর্তব্যরত অবস্থায় মুকসেমুল হাকিম স্ট্রোক করেন। কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি বুঝতে পারেননি তিনি। রাতে বাসায় ফেরার পর অসুস্থ বোধ করলে পরিবারের সদস্যরা তাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। পরে সেখানেই মারা যান ৪২ বছর বয়সী মি. হাকিম।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকরা পরিবারের সদস্যদের জানান, দুপুরে একবার তিনি স্ট্রোক করেছিলেন।
হাসপাতালে নেওয়ার সময় স্বজনদের মি. হাকিম জানিয়েছিলেন, দুপুর ১২টায় অফিসে শরীর খুব খারাপ হয়েছিল।
স্বজনদের তিনি জানিয়েছিলেন, দুপুরে ঘাড় ও হাত-পা ব্যথা, বমিভাব এবং মাথা ঝিম ঝিম করার মতো উপসর্গ দেখা দিয়েছিল।
তবে, আগে থেকে তার বড় কোন অসুস্থতা ছিল না।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, বাংলাদেশের মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশই ঘটছে স্ট্রোক, ডায়াবেটিস, কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ বা হৃদরোগ, ক্রনিক রেসপিরেটরি ডিজিজ বা দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগ এবং ক্যান্সার ও কিডনি জটিলতার মত রোগে।
আর এসব রোগে আক্রান্ত হয়ে বাংলাদেশে মানুষের মৃত্যু বাড়ছে।
এই ৭১ শতাংশের প্রায় অর্ধেক মানুষেরই আকস্মিক বা অকাল মৃত্যু হয় বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
এদিকে, বাংলাদেশের সরকারি প্রতিষ্ঠান রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের এক গবেষণাপত্রে, মানসিক সমস্যাও আকস্মিক মৃত্যুর একটি কারণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
সময় মতো স্ট্রোকের চিকিৎসা করলে মৃত্যুঝুঁকি এড়ানো সম্ভব
নন-কমিউনিকেবল ডিজিজ (এনসিডি) বা অসংক্রামক রোগ। এটিকে দীর্ঘমেয়াদী রোগও বলা হয়। জিনগত, শারীরিক, পরিবেশগত এবং আচরণগত বিভিন্ন বিষয়ের সমন্বিত প্রভাবে এ রোগগুলো হয়ে থাকে।
বয়স, অঞ্চল বা দেশ নির্বিশেষে সব ধরনের মানুষই অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত হন। এর মধ্যে প্রধানতম হচ্ছে, হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোক, ডায়াবেটিস, দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগ – যেমন ক্রনিক অবস্ট্রাক্টিভ পালমোনারি ডিজিজ ও হাঁপানি, ক্যান্সার এবং কিডনি জটিলতা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, এ রোগগুলোকে সাধারণত বয়স্কদের সমস্যা বলে মনে করা হলেও, প্রায় এক কোটি ৮০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয় ৭০ বছর বয়স হওয়ার আগেই।
এ বয়সে অন্য সব কারণে যত মানুষ মারা যায়, অসংক্রামক রোগের কারণে তার চেয়ে বেশি মারা যান। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, এসব অকাল মৃত্যুর প্রায় ৮২ শতাংশই ঘটে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে।
বিশ্বের মোট অসংক্রামক মৃত্যুর প্রায় তিন-চতুর্থাংশ বা তিন কোটি ২০ লাখ মানুষই এসব দেশে মারা যায়।
বাংলাদেশে ইদানীং প্রায়ই এমন ঘটনার কথা শোনা যায় যে, অফিসে কাজ করছিলেন, হঠাৎ ঢলে পড়ে সেখানেই মারা গিয়েছেন তিনি।
পরে চিকিৎসকদের বরাতে জানা যায়, কী কারণে ওই ব্যক্তি মারা গিয়েছেন।
বাংলাদেশের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতি বছর ৩০ থেকে ৬৯ বছর বয়সী দেড় কোটি লোক অসংক্রামক রোগে মারা যান।
সুস্থতার প্রধান শর্ত নিয়ন্ত্রিত জীবন-যাপন, শারীরিক পরিশ্রম
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউট আইইডিসিআরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ বা সিভিডি রোগ, বিশেষ করে করোনারি আর্টারি ডিজিজ ধীরে ধীরে মহামারীর রূপ নিচ্ছে।
একইসঙ্গে, উচ্চ রক্তচাপ ও হার্ট ফেইলিউরও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
হৃদযন্ত্রের কার্যক্রম সঠিকভাবে পরিচালিত হওয়ার জন্য হার্টে পর্যাপ্ত রক্ত সরবরাহ দরকার হয়।
হার্টে রক্ত সরবরাহকারী রক্তনালী যদি বন্ধ হয়ে যায় এবং এর ফলে যদি রক্ত হার্টে পৌঁছাতে না পারে, তাহলে হার্টের মাংসপেশিতে পর্যাপ্ত অক্সিজেন পৌঁছাতে পারে না। আর তখনই হয় হার্ট অ্যাটাক।
হার্ট অ্যাটাক হওয়ার জন্য আগে থেকেই অসুস্থ থাকাটা জরুরি নয়। বরং আপাত দৃষ্টিতে সুস্থ মানুষেরও হার্ট অ্যাটাক হতে পারে।
হার্ট অ্যাটাকের প্রথম উপসর্গই হচ্ছে বুকে ব্যথা। বুকের ডান বা বাম পাশে ব্যথা হবে না। একেবারে বুকের মাঝ বরাবর ব্যথা হবে। একে 'সেন্ট্রাল চেস্ট পেইন' বলে থাকেন চিকিৎসকরা। এ ব্যথা ক্রমাগত বাড়তে থাকবে।
বুকের ব্যথা একসময় বাম হাত ও ঘাড়ের দিকে ছড়িয়ে পড়ে।
এছাড়া যদি চোয়াল ও পিঠেও ব্যথা অনুভব হয়, তাহলে সেটি হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ হতে পারে। নারীদের মধ্যে এই উপসর্গ বেশি দেখা দেয়।
এছাড়া পেটে তীব্র ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, অতিরিক্ত ঘাম, বমি বমি ভাব ও বমিও হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ হতে পারে।
দেরি না করে এসব ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।