আন্তর্জাতিক ডেস্ক
জাপানে চলতি বছর মানুষের ওপর ভাল্লুকের হামলার ঘটনা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি রোধ করতে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ড্রোন এবং রোবটের মতো আধুনিক প্রযুক্তির অভিনব ব্যবহার শুরু হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বন্যপ্রাণী ও মানুষের এই সংঘাত দেশটির জনস্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সরকারি ও বিভিন্ন পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জাপানে গত এক বছরে ভাল্লুকের হামলায় ১৩ জনের প্রাণহানি ঘটেছে এবং আহত হয়েছেন ২২০ জনেরও বেশি মানুষ। পূর্ববর্তী বছরগুলোর তুলনায় এই সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূলত গ্রামাঞ্চলে দ্রুত জনসংখ্যা হ্রাস পাওয়া, কৃষিজমি ও বনাঞ্চলের সীমানা সংকুচিত হওয়া এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বনাঞ্চলে খাদ্যের সংকট তৈরি হওয়া এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী। এসব কারণে খাদ্যের সন্ধানে ভাল্লুকগুলো লোকালয়ে চলে আসছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত এক বছরে দেশটিতে প্রায় ৫০ হাজার বার ভাল্লুক দেখার খবর পাওয়া গেছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় জাপান সরকার ও স্থানীয় প্রশাসন বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা প্রাণঘাতী পদ্ধতির পরিবর্তে সুরক্ষামূলক ও অহিংস উপায়ের ওপর বেশি জোর দিচ্ছেন। এর অংশ হিসেবে লোকালয় এবং বনের সীমান্তবর্তী এলাকায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-যুক্ত উন্নত ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। এই ক্যামেরাগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভাল্লুকের গতিবিধি শনাক্ত করে তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সতর্ক করে দিচ্ছে। এছাড়া হোক্কাইডোর মতো দুর্গম ও বন্যপ্রাণীপ্রবণ এলাকায় ড্রোন ব্যবহার করে সার্বক্ষণিক নজরদারি চালানো হচ্ছে এবং প্রয়োজনে ড্রোন দিয়ে শব্দ সৃষ্টি করে ভাল্লুককে লোকালয় থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
কৃষিজমি ও জনবসতি রক্ষায় সৌরচালিত ‘মনস্টার উলফ’ বা রোবট নেকড়ের ব্যবহার বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। প্রায় চার হাজার মার্কিন ডলার মূল্যের এই রোবটটি দেখতে জাপানে একসময়ে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া নেকড়ের মতো এবং এটি বিভিন্ন ধরনের ভীতিকর শব্দ তৈরি করে ভাল্লুককে আতঙ্কিত করে দূরে রাখে। পাশাপাশি, সাধারণ মানুষের সুরক্ষার স্বার্থে ড্যানিয়েল কোকা নামের এক প্রকৌশলী ‘কুমাম্যাপ’ নামক একটি বিশেষ মোবাইল অ্যাপ তৈরি করেছেন। এই অ্যাপের মাধ্যমে প্রায় ৬০ লাখ ব্যবহারকারী নিজ নিজ এলাকার ভাল্লুকের গতিবিধি সম্পর্কে রিয়েল-টাইম তথ্য জানতে পারছেন, যা তাদের সাবধানে চলাফেরা করতে সহায়তা করছে।
আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী ও পরিবেশবান্ধব পদ্ধতিরও সাহায্য নিচ্ছে জাপান। ফিনল্যান্ড থেকে বিশেষভাবে আমদানিকৃত ‘কারেলিয়ান বিয়ার ডগ’ বা ভাল্লুক তাড়ানোর বিশেষ জাতের কুকুর ব্যবহার করা হচ্ছে। এই প্রশিক্ষিত কুকুরগুলো কোনো ধরনের শারীরিক ক্ষতি ছাড়াই ভাল্লুককে নিরাপদ দূরত্বে তাড়িয়ে দিতে সক্ষম। প্রযুক্তি এবং ঐতিহ্যবাহী এই কৌশলের সমন্বয় ভবিষ্যতে মানুষ ও বন্যপ্রাণীর মধ্যকার সংঘাত উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।