আইন আদালত ডেস্ক
সন্তান কিংবা নিকটাত্মীয়ের নামে সম্পত্তি হস্তান্তর বা দান করার পরেও দাতার জীবদ্দশায় সেই সম্পত্তি ভোগ করার সুযোগ রেখে জাতীয় সংসদে ‘দ্য ট্রান্সফার অব প্রপার্টি অ্যাক্ট’ বা সম্পত্তি হস্তান্তর আইন সংশোধন বিল পাস হয়েছে। রবিবার জাতীয় সংসদ অধিবেশনে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বিলটি সংসদে উত্থাপন করেন। পরে তা কণ্ঠভোটে পাস হয়। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন। প্রস্তাবিত এই আইন দেশের সব ধর্মের মানুষের ক্ষেত্রে সমভাবে কার্যকর হবে বলে জানিয়েছে সরকার।
পাস হওয়া বিলের বিধান অনুযায়ী, বাবা-মা কিংবা দাদা-দাদি বা নানা-নানির কাছ থেকে সন্তান বা নাতি-নাতনির নামে সম্পত্তি দান করা হলে, দাতা জীবিত থাকা পর্যন্ত ওই সম্পত্তি তিনিই ভোগ করতে পারবেন। একইভাবে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পত্তি দানের ক্ষেত্রেও দাতার জীবনকালীন ভোগাধিকার বহাল থাকবে। এ ছাড়া দাতার জীবদ্দশায় সম্পত্তির গ্রহীতার মৃত্যু হলে দাতার ভোগের অধিকার বজায় থাকবে। পরবর্তী সময়ে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ওই সম্পত্তি গ্রহীতার উত্তরাধিকারীদের কাছে হস্তান্তরিত হবে।
বিলের উদ্দেশ্য ও কারণসংবলিত বিবৃতিতে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান জানান, প্রচলিত আইনে সম্পত্তি হস্তান্তরের বিভিন্ন পদ্ধতি থাকলেও দাতার জীবদ্দশায় সম্পত্তির ভোগাধিকার সংরক্ষণ করে দানের বিষয়ে স্পষ্ট কোনো বিধান ছিল না। প্রস্তাবিত সংশোধনের মাধ্যমে জীবনকালীন ভোগাধিকার সংরক্ষণ করে সম্পত্তি দানের একটি স্বতন্ত্র ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে। তিনি আরও স্পষ্ট করেন যে, নতুন এই বিধান সব ধর্মের মানুষের ক্ষেত্রে সমভাবে কার্যকর হবে। এর ফলে প্রচলিত সাধারণ দান, মুসলিম আইনের অধীনে হেবা কিংবা আইনস্বীকৃত অন্য কোনো সম্পত্তি হস্তান্তর পদ্ধতির ওপর কোনো প্রভাব পড়বে না এবং কোনো ধরনের সাংঘর্ষিক পরিস্থিতিও সৃষ্টি হবে না।
আইনটি পাসের প্রক্রিয়ার সময় বিরোধী দলের পক্ষ থেকে আপত্তি জানানো হয়। বিল পাসের আগে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করে বিরোধী দল। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন বিলটির বিরোধিতা করে বক্তব্য দেন। তিনি বিলটিকে কোরআন-সুন্নাহর পরিপন্থি দাবি করে তা পাস না করার আহ্বান জানান। তার মতে, এর মাধ্যমে দাতার আজীবন সম্পত্তি ভোগের সুযোগ রাখা হলে ইসলামী উত্তরাধিকার আইনের বিধানকে পাশ কাটানোর আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। দেশের কয়েকজন প্রখ্যাত আলেমও প্রস্তাবিত ব্যবস্থাকে ইসলামী আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মত দিয়েছেন বলে তিনি দাবি করেন। এ ছাড়া প্রস্তাবিত আইন কার্যকর হলে উত্তরাধিকারীদের প্রাপ্য সম্পত্তির অধিকার নিয়ে ভবিষ্যতে আইনি জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলেও তিনি মত প্রকাশ করেন।
তবে এসব আপত্তির বিপরীতে সরকারি দলের নীতিনির্ধারকরা বলছেন, বয়োবৃদ্ধ বাবা-মায়েদের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতেই এই সংশোধন আনা হয়েছে। বর্তমান সামাজিক বাস্তবতায় অনেক সময় সন্তানকে সম্পত্তি লিখে দেওয়ার পর বাবা-মায়েরা অবহেলার শিকার হন এবং নিজ বাড়িতেই চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েন। এই সংশোধিত আইনের ফলে সম্পত্তি হস্তান্তরের পরও বাবা-মায়েরা তাদের জীবনকালে আইনি অধিকার হারাবেন না এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন নিশ্চিত করতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে পারিবারিক বিরোধ ও আদালতে দীর্ঘসূত্রিতাও হ্রাস পাবে বলে আশা করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।