বাংলাদেশ ডেস্ক
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট আন্তঃসীমান্ত সংকট মোকাবিলায় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আঞ্চলিক সহযোগিতা ও সম্মিলিত উদ্যোগ জোরদার করার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন চট্টগ্রাম-১০ আসনের সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমান। তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব কোনো একক দেশের পক্ষে বিচ্ছিন্নভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।
রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) ভুটানের রাজধানী থিম্পুতে অনুষ্ঠিত দুই দিনব্যাপী ‘সাউথ এশিয়ান পার্লামেন্টারি ডায়ালগ অন এনভায়রনমেন্ট, ক্লাইমেট অ্যান্ড সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের সংসদীয় সংলাপে বক্তব্য প্রদানকালে তিনি এসব কথা বলেন। থিম্পুতে এই সম্মেলন চলাকালীন তিনি ভুটানের প্রধানমন্ত্রী দাশো শেরিং তোবগের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। ওই সময় ভুটানের জাতীয় পরিষদের ডেপুটি স্পিকার সাংয়ে খান্ডুও সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
সংলাপে মূল বক্তব্যে সাঈদ আল নোমান বলেন, জলবায়ু সংকট কোনো ভৌগোলিক সীমানা মেনে চলে না; তাই এর টেকসই সমাধানও কোনো নির্দিষ্ট সীমান্তের মধ্যে আটকে রাখা উচিত নয়। কেবল পৃথক জাতীয় উদ্যোগের ওপর নির্ভর না করে জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় বৈশ্বিক সহমর্মিতা এবং কার্যকর সম্মিলিত পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান তিনি। দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলটি ক্রমেই অভিন্ন ও বহুমাত্রিক জলবায়ু ঝুঁকির মুখে পড়ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। বিশেষ করে প্রলয়ংকরী বন্যা, আকস্মিক ভূমিধস, দীর্ঘস্থায়ী খরা এবং পরিবেশের অবক্ষয়ের কারণে পুরো অঞ্চলের কৃষি উৎপাদন, খাদ্য নিরাপত্তা এবং জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি হচ্ছে বলে তিনি সতর্ক করেন।
এ ধরনের বহুমুখী সংকট উত্তরণে বিচ্ছিন্ন জাতীয় কৌশলের পরিবর্তে একটি সমন্বিত ও আন্তঃসংযুক্ত আঞ্চলিক উদ্যোগ গড়ে তোলার তাগিদ দেন এই সংসদ সদস্য। তিনি দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য একটি অভিন্ন জলবায়ু শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা জোরদার করা, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন, আন্তঃসীমান্ত সহযোগিতা বাড়ানো এবং পরিবেশবান্ধব জীবনযাত্রায় জনসচেতনতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।
দুই দিনব্যাপী এই গুরুত্বপূর্ণ সংলাপে দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, মন্ত্রী, সংসদ সদস্য এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীরা অংশ নেন। সম্মেলনে জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধি, টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার নিশ্চিতকরণ, দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং সাম্প্রতিক জলবায়ু দুর্যোগে সৃষ্ট গুরুতর মানবিক বিপর্যয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বিশেষ করে নেপালে সাম্প্রতিক সময়ে সংঘটিত প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে সৃষ্ট মানবিক সংকটের বিষয়টি আলোচনায় বিশেষ প্রাধান্য পায়। বক্তারা এ সময় সতর্ক করে জানান যে, বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় এখনই কার্যকর ও দূরদর্শী পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে আগামীতে দক্ষিণ এশিয়ার কোটি কোটি মানুষ আরও তীব্র জলবায়ুজনিত সংকটের মুখে পড়তে পারেন।
উল্লেখ্য, ‘সাউথ এশিয়ান পার্লামেন্টারিয়ানস ফোরাম’-এর (এসএআরপিএফ) চেয়ারম্যান ড. সঞ্জয় জয়সওয়াল এই দুই দিনব্যাপী সংলাপের সভাপতিত্ব করেন। সংলাপে আরও বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রবিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারপারসন সংসদ সদস্য জাহারাত আদিব চৌধুরী, ভুটানের জলবায়ু ও পরিবেশবিষয়ক দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী লিয়নপো ইয়ুনতেন ফুনশো, জাতিসংঘ অফিস ফর প্রজেক্ট সার্ভিসেসের (ইউএনওপিএস) স্ট্র্যাটেজিক অ্যাডভাইস অ্যান্ড সাপোর্ট বিভাগের প্রধান ও ক্লাইমেট অ্যাকশন প্রোগ্রাম ম্যানেজার ড. সামান্থা স্ট্র্যাটন-শর্ট, ভুটানে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) কান্ট্রি ডিরেক্টর সোনোমি তানাকা এবং ইন্টারন্যাশনাল সোলার অ্যালায়েন্সের প্রতিনিধি নার বাহাদুর। এ ছাড়া সংলাপে দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের সংসদ সদস্য, সরকারি নীতিনির্ধারক, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা এবং উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ প্রতিনিধিরা সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।
সংলাপের সমাপনী পর্বে অংশগ্রহণকারী বিশেষজ্ঞরা একমত পোষণ করেন যে, জলবায়ু পরিবর্তন বর্তমান সময়ে কোনো একক দেশের বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়, এটি সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার একটি অভিন্ন ও অস্তিত্বের সংকট। এই সংকট সফলভাবে মোকাবিলা করতে হলে প্রয়োজন শক্তিশালী অভিন্ন নেতৃত্ব, পারস্পরিক আস্থামূলক সহযোগিতা এবং সুপরিকল্পিত সমন্বিত পদক্ষেপ। বক্তারা কেবল দুর্যোগ পরবর্তী ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ ও ত্রাণ বিতরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, বরং বর্তমান সময় থেকেই দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস, জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো তৈরি এবং সমন্বিত প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রমে পর্যাপ্ত বিনিয়োগের ওপর জোর দেন।