জেলা প্রতিনিধি
বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এক রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে রোগীর স্বজন ও ইন্টার্ন চিকিৎসকদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এই সংঘর্ষে উভয় পক্ষের অন্তত ১২ জন আহত হয়েছেন। ঘটনার জেরে নিজেদের শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং হামলাকারীদের দ্রুত গ্রেফতারের দাবিতে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি শুরু করেছেন ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা।
গত মঙ্গলবার দিবাগত রাতে হাসপাতালের মেডিসিন ওয়ার্ডে এই অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। হাসপাতাল ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, বগুড়া সদর উপজেলার রাজাপুর এলাকার বাসিন্দা আব্দুল মালেক নামের এক ব্যক্তি গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় মঙ্গলবার সন্ধ্যায় শজিমেক হাসপাতালের মেডিসিন ওয়ার্ডে ভর্তি হন। সেখানে কর্তব্যরত ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা তাকে জরুরি চিকিৎসা প্রদান করেন। কিন্তু রাত ১০টার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওই রোগীর মৃত্যু হয়। রোগীর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর তার স্বজন ও স্থানীয় ১০ থেকে ১৫ জন বহিরাগত ব্যক্তি ওয়ার্ডে প্রবেশ করে চিকিৎসকদের ওপর চড়াও হন। কয়েক দফায় চলা এই হামলা ও মারধরের ঘটনায় ছয়জন ইন্টার্ন চিকিৎসক গুরুতর আহত হন। চিকিৎসকদের দাবি, হামলায় তাদের তিনজনের হাতের হাড় ভেঙে গেছে। এই ঘটনার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় রাত ১২টা থেকে হাসপাতালের জরুরি বিভাগ ছাড়া অন্যান্য সেবা কার্যক্রমে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতির ডাক দেন ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা।
অন্যদিকে, রোগীর স্বজনদের পক্ষ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন অভিযোগ তোলা হয়েছে। তাদের দাবি, হাসপাতালের একজন ইন্টার্ন চিকিৎসকের ভুল ইনজেকশন প্রয়োগের ফলেই রোগীর দ্রুত অবনতি ঘটে এবং মৃত্যু হয়। এই বিষয়ে চিকিৎসকদের কাছে ব্যাখ্যা চাইতে গেলে প্রথমে উভয়ের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়, যা পরবর্তীতে হাতাহাতি ও সংঘর্ষে রূপ নেয়। স্বজনদের অভিযোগ, সংঘর্ষের পর ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা তাদের পক্ষের ছয়জনকে মারধর করে হাসপাতালের ভেতরে দীর্ঘ সময় অবরুদ্ধ করে রাখেন। খবর পেয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং অবরুদ্ধ ব্যক্তিদের উদ্ধার করে।
বগুড়া সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইব্রাহিম আলী জানান, মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে হাসপাতালের মেডিসিন ওয়ার্ডে রোগীর স্বজন ও চিকিৎসকদের মধ্যে সংঘর্ষের খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে যায়। সেখানে পৌঁছে পুলিশ জানতে পারে যে ভুল চিকিৎসার অভিযোগ তুলে বহিরাগতদের সহায়তায় চিকিৎসকদের ওপর হামলা চালানো হয়েছিল। পরবর্তীতে পুলিশ হাসপাতালের ভেতর থেকে অবরুদ্ধ ছয়জনকে উদ্ধার করে প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান করে। এর মধ্যে শারীরিক অবস্থা কিছুটা অবনতি হওয়ায় চারজনকে পুলিশি তত্ত্বাবধানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রাখা হয়েছে এবং বাকি দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় আনা হয়েছে। পুলিশ কর্মকর্তা আরও জানান, এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষ থেকেই থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়নি। তবে অভিযোগ প্রাপ্তিসাপেক্ষে ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এই ঘটনার ফলে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সাধারণ রোগীরা চরম ভোগান্তির মুখে পড়েছেন। দেশের একটি বড় সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসকদের নিরাপত্তা এবং ভুল চিকিৎসার অভিযোগের এই পাল্টাপাল্টি পরিস্থিতি চিকিৎসাসেবা খাতের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। উদ্ভূত সংকট নিরসনে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে।