বাংলাদেশ ডেস্ক
মেধা, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধের সমন্বয়ে দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে আগামী ২০২৮ শিক্ষাবর্ষ থেকে দেশের শিক্ষাক্রম নতুন করে সাজানো হবে এবং পুরো কারিকুলামে ব্যাপক সংস্কার আনা হবে। এই রূপান্তরের প্রথম ধাপ হিসেবে আগামী শিক্ষাবর্ষ (২০২৭) থেকেই চতুর্থ শিল্পবিপ্লব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও খেলাধুলাবিষয়ক নতুন বিষয় পাঠ্যক্রমে যুক্ত করা হচ্ছে।
সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাত হিসেবে শিক্ষাব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফেরাতে শিক্ষা সংস্কার কমিশন গঠনের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থার অংশ হিসেবে আগামী শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যপুস্তকে প্রয়োজনীয় পরিমার্জন, সংযোজন ও বিয়োজন করা হচ্ছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে বেশ কিছু নতুন বই ও বিষয় অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে। এর মধ্যে চতুর্থ শ্রেণি থেকে খেলাধুলা ও শারীরিক শিক্ষাভিত্তিক ‘স্পোর্টস অ্যান্ড কালচার’ এবং ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ ও ‘টেকনিক্যাল এডুকেশন’ পাঠ্যক্রমে যুক্ত করা হবে। এর মূল লক্ষ্য হলো শিক্ষার্থীদের রোবটিক্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত করে তোলা।
পরীক্ষাকেন্দ্রিক মূল্যায়ন ও ফলাফলের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার বিষয়েও কঠোর অবস্থান নিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। অতীতে ফলাফল স্ফীতি বা কৃত্রিমভাবে জিপিএ-৫ বাড়িয়ে দেখানোর প্রবণতা এবং পরীক্ষা ছাড়াই পাস করিয়ে দেওয়ার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা হয়েছে। বর্তমান মূল্যায়নে কোনো ধরনের গ্রেস নম্বর না দিয়ে শিক্ষার্থীদের শতভাগ নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ মূল্যায়ন নিশ্চিত করা হয়েছে, যাতে তারা তাদের প্রকৃত মেধার প্রতিফলন দেখতে পায়।
এদিকে, সদ্য প্রকাশিত এসএসসি পরীক্ষায় অকৃতকার্য এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ঝরে পড়ার ঝুঁকিতে থাকা শিক্ষার্থীদের সুরক্ষায় বিশেষ নীতি প্রণয়ন করা হচ্ছে। এসব শিক্ষার্থীকে টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার (টিটিসি) এবং বিভিন্ন স্বল্পমেয়াদি কারিগরি ও ভোকেশনাল কোর্সের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের উপযোগী করে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রয়োজনে তাদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থাও করা হবে। পাশাপাশি, বেকারত্ব দূরীকরণে বিভাগ ও জেলা পর্যায়ে ‘এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যার মাধ্যমে চাকরিপ্রার্থীরা নিজেদের দক্ষতার তথ্য নিবন্ধন করতে পারবেন এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
শিক্ষকদের পেশাগত উৎকর্ষ ও ডিজিটাল দক্ষতা বাড়াতে পর্যায়ক্রমে ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচির আওতায় দেশের সব পর্যায়ের শিক্ষকদের হাতে ট্যাবলেট পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণার পরিধি বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় শিল্পের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের যৌথ গবেষণার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এছাড়া, প্রবাসী বাংলাদেশি গবেষক ও অভিজ্ঞ শিক্ষকদের দেশে ফিরিয়ে এনে ‘ব্রেন ড্রেন’ বা মেধা পাচারকে ‘ব্রেন সার্কুলেশন’-এ রূপান্তরের কৌশলগত পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে।
সরকারের নীতিনির্ধারকদের মতে, প্রথাগত সনদনির্ভর শিক্ষার পরিবর্তে ব্যবহারিক দক্ষতা, কর্মসংস্থানমুখী জ্ঞান, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন একটি প্রজন্ম গড়ে তোলার মাধ্যমেই নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।