অর্থ বাণিজ্য ডেস্ক
সহজ শর্তে দ্রুত ঋণ দেওয়ার লোভ দেখিয়ে সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নেওয়া এবং অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে জড়িত ৩১টি অননুমোদিত মোবাইল অ্যাপ ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের বিষয়ে কঠোর সতর্কবার্তা জারি করেছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। দেশের সাধারণ নাগরিকদের আর্থিক নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এ ধরনের অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও অ্যাপ থেকে যেকোনো ধরনের ঋণ নেওয়া থেকে বিরত থাকার জন্য বিশেষভাবে আহ্বান জানিয়েছে আর্থিক খাতের এই গোয়েন্দা সংস্থা।
গত বৃহস্পতিবার প্রকাশিত বিএফআইইউর এক সতর্কবার্তায় জানানো হয়, বর্তমান সময়ে বিভিন্ন মোবাইল অ্যাপ, অনলাইন পোর্টাল এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নানা গ্রুপে আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে খুব সহজেই স্বল্প সুদে এবং ন্যূনতম কাগজপত্রে ঋণ দেওয়ার প্রলোভন দেখানো হচ্ছে। এসব চটকদার বিজ্ঞাপনে আকৃষ্ট হয়ে সাধারণ মানুষ যখন সংশ্লিষ্ট অ্যাপগুলো ডাউনলোড করেন কিংবা অনলাইনে আবেদন করেন, তখন প্রতারক চক্র অত্যন্ত কৌশলে গ্রাহকদের জাতীয় পরিচয়পত্র, মোবাইল ফোনের কন্টাক্ট লিস্ট বা যোগাযোগের তালিকা, ব্যক্তিগত ছবি এবং অন্যান্য সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহ করে থাকে।
প্রাথমিক তদন্ত ও প্রাপ্ত অভিযোগের ভিত্তিতে বিএফআইইউর নজরে আসা ৩১টি অননুমোদিত ঋণদাতা অ্যাপ ও প্ল্যাটফর্মের মধ্যে রয়েছে— সাথী লোন, পপক্যাশ, ফিনক্যাশ, কুইক লোন, কুইক টাকা, ঢাকা ফিন, লোনভাইব, দোস্ত লোন, টাকা ক্যাশ লোন, কেওয়নজা লোন, এসএসএইচ মানি, লোনবাডি, সাথি লোন, ক্যাশহোরা, আলো ক্যাশ, ফাস্ট লোন, ইজি টাকা, ধৈর্য লোন, ফিন ডট ডু, বঙ্গক্যাশ, আশা লোন, সুবিধা লোন, স্মার্ট লোন বিডি, অনলাইন লোন বিডি, সিটি অনলাইন লোন, বিডি সহজ লোন, ক্যাশ লোন, সোনালী, লোনহাট ও টাকানাও। এসব অ্যাপের কার্যক্রম সম্পূর্ণ অননুমোদিত এবং জননিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এসব অবৈধ প্ল্যাটফর্ম থেকে ঋণ গ্রহণের পর গ্রাহকদের ওপর নানামুখী মানসিক চাপ সৃষ্টি করা হয়। ঋণের নির্ধারিত কিস্তি বা অতিরিক্ত টাকা আদায়ের নামে গ্রাহকদের নানা ধরনের ভয়ভীতি দেখানো, মুঠোফোনে থাকা পরিচিত ব্যক্তিদের কাছে গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশের হুমকি দেওয়া এবং চুক্তির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করার মতো গুরুতর অপরাধমূলক কার্যক্রমের অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে ভুক্তভোগীরা কেবল আর্থিকভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন না, বরং সামাজিকভাবেও চরম হেনস্তার শিকার হচ্ছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বিদ্যমান বিধিমালা অনুযায়ী, বাংলাদেশে ঋণ দেওয়ার কার্যক্রম কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত। দেশের প্রচলিত আইন, ব্যাংক খাতের নিয়ন্ত্রক কাঠামো এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুনির্দিষ্ট অনুমোদন ছাড়া কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, ওয়েবসাইট বা ডিজিটাল অ্যাপের মাধ্যমে এ ধরনের আর্থিক লেনদেন বা ঋণ কার্যক্রম পরিচালনা করার কোনো আইনি বৈধতা নেই। কিন্তু এক শ্রেণির অসাধু চক্র নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে ডিজিটাল মাধ্যমকে ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের অজ্ঞতার সুযোগ নিচ্ছে।
এ ধরনের প্রতারণা থেকে রক্ষা পেতে বিএফআইইউর পক্ষ থেকে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে— অপরিচিত বা সন্দেহজনক কোনো অ্যাপে জাতীয় পরিচয়পত্র, ব্যাংক হিসাবের তথ্য, ব্যক্তিগত ছবি বা মোবাইলের কন্টাক্ট লিস্টের মতো সংবেদনশীল তথ্য সরবরাহ না করা। এছাড়া, ঋণ অনুমোদনের নামে কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি যদি অগ্রিম টাকা, নিবন্ধন ফি বা প্রসেসিং ফি দাবি করে, তবে সে বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
যদি কোনো নাগরিক ইতোমধ্যে এ ধরনের অননুমোদিত প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে প্রতারণার শিকার হন কিংবা এ ধরনের অবৈধ কার্যক্রম পরিচালনাকারী কোনো চক্রের সন্ধান পান, তবে দ্রুত তা সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা উপযুক্ত কর্তৃপক্ষকে জানানোর জন্য অনুরোধ করা হয়েছে। মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ অনুযায়ী প্রতারণার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের অর্থ আত্মসাৎ করা একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তাই জনস্বার্থে এ ধরনের ক্ষতিকর ও অবৈধ আর্থিক কার্যক্রম থেকে দূরে থাকার জন্য সবাইকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে বিএফআইইউ।