বাংলাদেশ ডেস্ক
দেশের জ্বালানি খাতের দীর্ঘমেয়াদি গ্যাস সংকট এবং সার ব্যবস্থাপনা নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা ও পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে। গত মঙ্গলবার সকালে সচিবালয়ে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক ও জ্বালানি পরিস্থিতি সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি জানান, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং শিল্পকারখানা সচল রাখতে বহুমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা বলেন, গ্যাসসংকট কোনো সাময়িক বিষয় নয়, এটি বহু বছরের পুঞ্জীভূত একটি সমস্যা। দীর্ঘদিন ধরে দেশের স্থলভাগে নতুন গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম বন্ধ থাকায় বর্তমান সময়ে গ্যাসের ঘাটতি প্রকট আকার ধারণ করেছে। বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে আমদানিকৃত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) দামেও বড় ধরনের ঊর্ধ্বগতি দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে গত বছর যে গ্যাসের দাম প্রতি ইউনিট ১২ থেকে ১৪ ডলারে পাওয়া যেত, তা বেড়ে বর্তমানে ২৪ ডলারে পৌঁছেছে। জ্বালানি খাতের এই বাড়তি চাপের মধ্যেও সরকার জনদুর্ভোগ কমাতে এবং শিল্প উৎপাদন অব্যাহত রাখতে কাজ করে যাচ্ছে।
সংকট মোকাবেলার অংশ হিসেবে ক্ষতিগ্রস্ত ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট (এফএসআরইউ) ইতোমধ্যে মেরামত সম্পন্ন করা হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সরবরাহকৃত কার্গো আসতে সাময়িক কিছু জটিলতা তৈরি হয়েছে, যা শিগগিরই নিরসন হবে বলে আশা করা হচ্ছে। পাশাপাশি, শিল্পকারখানা সচল ও উৎপাদনমুখী রাখতে উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনা চলছে। এর অংশ হিসেবে বকেয়া গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিল এককালীন পরিশোধের পরিবর্তে ১২ মাসের সহজ কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। এছাড়া প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর মাত্রাতিরিক্ত চাপ কমাতে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে দেশের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে তাদের পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জ্বালানি খাতের দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের লক্ষ্যে ভোলার নতুন গ্যাসক্ষেত্র থেকে জাতীয় গ্রিডে দ্রুত গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি জরুরি পাইপলাইন নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাই ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। এই প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের দক্ষিণাঞ্চলসহ জাতীয় পর্যায়ে গ্যাসের সরবরাহ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পাবে।
প্রেস ব্রিফিংয়ে সার সংকটের গুঞ্জন নাকচ করে দিয়ে উপদেষ্টা জানান, দেশে সারের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে এবং অতিরিক্ত মজুদও সংরক্ষিত আছে। তবে সার বিতরণ ব্যবস্থাপনায় কিছু পরিবর্তন আনার কারণে প্রাথমিক পর্যায়ে কিছুটা বিশৃঙ্খলা বা অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। কৃষকদের স্বার্থ রক্ষার্থেই এই সংস্কার আনা হয়েছে এবং নতুন এই পদ্ধতির সঙ্গে সামঞ্জস্য আনতে গিয়ে কিছু এলাকায় সাময়িক সমস্যা তৈরি হলেও সরকার তা কঠোরভাবে নজরদারি করছে। কোথাও সার বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
কৃষি খাতের সুরক্ষায় সারের কোনো ঘাটতি যেন না হয়, সে জন্য সরকার আমদানির পরিমাণ বাড়িয়ে দিয়েছে। সম্প্রতি সরকারি ক্রয় কমিটির বৈঠকে নতুন করে ৩ লাখ ৬৫ হাজার মেট্রিক টন সার আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মাত্র এক সপ্তাহ আগে কানাডা, রাশিয়া এবং সৌদি আরব থেকে আরও ১ লাখ ১৫ হাজার মেট্রিক টন সার আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে দেশে ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি এবং এমওপি সার মিলিয়ে মোট প্রায় ১৩ লাখ ৬৫ হাজার মেট্রিক টন সার মজুদ রয়েছে, যা বর্তমান চাহিদার তুলনায় যথেষ্ট। সরকারের এই সময়োপযোগী ও বহুমুখী পদক্ষেপের ফলে আগামী দিনে দেশের শিল্প ও কৃষি খাত আরও গতিশীল হবে বলে আশা করা হচ্ছে।