খেলাধুলা ডেস্ক
আধুনিক ফুটবল বিশ্বে কেবল মাঠে ট্রফি জয়ই সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি নয়, বরং মাঠের বাইরের ডাগআউট ও করপোরেট কার্যালয়েও সমান তালে চলছে অর্থনৈতিক শক্তির লড়াই। গ্রীষ্মকালীন প্রাক-মৌসুম সফর থেকে শুরু করে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে নতুন কার্যালয় স্থাপন—সবকিছুর পেছনেই কাজ করছে ক্লাবের ‘ব্র্যান্ড ভ্যালু’ বা বাণিজ্যিক মূল্য বাড়ানোর নিরন্তর প্রতিযোগিতা। এই আর্থিক ব্র্যান্ডের প্রতিযোগিতায় সব প্রতিদ্বন্দীকে পেছনে ফেলে ইউরোপীয় ফুটবলের শীর্ষে অবস্থান করছে স্প্যানিশ জায়ান্ট রিয়াল মাদ্রিদ।
ব্র্যান্ড ফাইন্যান্সের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, স্প্যানিশ লিগে শিরোপা হাতছাড়া বা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায়ের মতো মাঠের পারফরম্যান্সগত বিপর্যয় সত্ত্বেও গত এক বছরে রিয়াল মাদ্রিদের ব্র্যান্ড ভ্যালু ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে ক্লাবটির ব্র্যান্ড মূল্য দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৪০ কোটি বা ২ দশমিক ৪ বিলিয়ন ইউরোতে। বছরের বিভিন্ন সময়ে কোচ পরিবর্তনজনিত নাটকীয়তা ও প্রশাসনিক রদবদল সত্ত্বেও তাদের এই আর্থিক প্রবৃদ্ধিতে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি। এই তালিকার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ১৫ শতাংশ ব্র্যান্ড মূল্য বাড়িয়ে ২০০ কোটি বা ২ বিলিয়ন ইউরো নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে অপর স্প্যানিশ ক্লাব বার্সেলোনা। ক্যাম্প ন্যু স্টেডিয়ামের সংস্কার কাজ ও আর্থিক সংকটের প্রাথমিক চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে এবং স্প্যানিশ শিরোপা ধরে রাখার পর প্রধান স্পন্সরশিপের কল্যাণে কাতালান ক্লাবটি নিজেদের এই শক্তিশালী অবস্থান ধরে রেখেছে।
এদিকে ক্লাব ফুটবলের সামগ্রিক বাজার ব্যবস্থাপনায় একক আধিপত্য বজায় রেখেছে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ (ইপিএল)। বিশ্বের সেরা ৫০টি ক্লাবের এই তালিকায় একা ২০টি স্থান দখল করে নিয়েছে প্রিমিয়ার লিগের ক্লাবগুলো। এসব ইংলিশ ক্লাবের সম্মিলিত ব্র্যান্ড মূল্য দাঁড়িয়েছে ৮৭০ কোটি ইউরো, যা কেবল লা লিগার মোট ব্র্যান্ড মূল্যের তুলনায় প্রায় ৩০০ কোটি ইউরো বেশি। ইপিএল ক্লাবগুলোর মধ্যে সেরা তিনের মধ্যে উঠে এসেছে আর্সেনাল, যাদের ব্র্যান্ড মূল্য ১৫৩ কোটি ৬০ লাখ ইউরো। এর ঠিক পরেই চতুর্থ স্থানে রয়েছে জার্মানির বায়ার্ন মিউনিখ, যাদের ব্র্যান্ড মূল্য ১৫১ কোটি ৫০ লাখ ইউরো। পঞ্চম স্থানে রয়েছে ফ্রান্সের পিএসজি, যাদের ব্র্যান্ড মূল্য ১৫০ কোটি ৩ লাখ ইউরো। এরপরের অবস্থানগুলোতে রয়েছে যথাক্রমে ম্যানচেস্টার সিটি, লিভারপুল, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ও চেলসি। তবে মাঠের পারফরম্যান্সে ধারাবাহিক অফফর্মের কারণে সেরা দশের তালিকা থেকে ছিটকে গেছে টটেনহ্যাম হটস্পার। তাদের এই পতনের সুযোগ নিয়ে তালিকার দশম স্থান দখল করে নিয়েছে জার্মানির বরুসিয়া ডর্টমুন্ড।
ইউরোপের অন্যান্য অঞ্চলের মধ্যে জার্মান ফুটবলে একক দাপট ধরে রেখে বায়ার্ন মিউনিখ চতুর্থ অবস্থান নিশ্চিত করেছে। তবে ঐতিহ্যবাহী ইতালিয়ান ফুটবলের বর্তমান অর্থনৈতিক ও কাঠামোগত অবস্থা খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয়। জাতীয় দলের টানা ব্যর্থতার নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্টতই দেশটির ক্লাব ফুটবলেও পড়েছে। ইন্টার মিলান ও এসি মিলান তাদের নিজ নিজ ব্র্যান্ড ভ্যালু সামান্য বাড়াতে সক্ষম হলেও ১৭ শতাংশ বড় ধরনের দরপতনের শিকার হয়ে পিছিয়ে পড়েছে জুভেন্টাস, যাদের ব্র্যান্ড মূল্য বর্তমানে নেমে এসেছে ৪১ কোটি ৯ লাখ ইউরোতে।
ফরাসি ক্লাব ফুটবলে এক চরম কাঠামোগত বৈষম্য লক্ষ্য করা গেছে। ইউরোপীয় এই তালিকার শীর্ষ ৫০টি ক্লাবের মধ্যে ফ্রান্স থেকে স্থান পেয়েছে মাত্র দুটি ক্লাব। প্যারিস সেন্ট জার্মেই বা পিএসজি টানা চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়ের সুবাদে নিজেদের একটি বিশ্বজনীন ব্র্যান্ডে রূপান্তর করতে সক্ষম হলেও, রাজধানী প্যারিসের বাইরে ফরাসি লিগের অন্যান্য ক্লাবের আর্থিক অবস্থান দিন দিন দুর্বল হয়ে পড়ছে। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, তালিকার অপর ফরাসি ক্লাব অলিম্পিক মার্সেইয়ের তুলনায় পিএসজির ব্র্যান্ড মূল্য বর্তমানে প্রায় ১১ গুণ বেশি।
ইউরোপের ঐতিহ্যবাহী শীর্ষ পাঁচ লিগের ভৌগোলিক সীমার বাইরেও পর্তুগাল ও নেদারল্যান্ডসের শীর্ষস্থানীয় ক্লাবগুলো নিজেদের শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছে। তবে ইউরোপীয় সীমানার বাইরে বৈশ্বিক ফুটবলে সবচেয়ে বড় চমক দেখিয়েছে ব্রাজিলের দুটি ঐতিহ্যবাহী ক্লাব—ফ্ল্যামেঙ্গো ও পালমেইরাস, যারা যথাক্রমে ৩২তম ও ৪৯তম স্থান অর্জন করেছে। জাতীয় দলের মাঠের পারফরম্যান্স আশানুরূপ না হওয়া সত্ত্বেও সাম্প্রতিক সময়ে ব্রাজিলের শীর্ষ স্তরের ক্লাবগুলোর সামগ্রিক আয় ও বাণিজ্যিক প্রসার উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বিশ্ব ফুটবলের নতুন অর্থনৈতিক বিন্যাসকেই নির্দেশ করে।