অর্থ বাণিজ্য ডেস্ক
দেশের বিদ্যুৎ ও গ্যাস খাতের সংকট নিরসনে বর্তমান সরকার স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বিশেষ করে জ্বালানি খাতের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা এফএসআরইউ (FSRU) চালুর বিষয়ে নীতিগত আলোচনা চলমান রয়েছে। একই সঙ্গে দেশীয় স্থলভাগে অবস্থিত গ্যাসের উৎসগুলো থেকে উৎপাদন বৃদ্ধি এবং নতুন পাইপলাইন নির্মাণের কাজও শুরু হয়েছে।
রাজধানীর মতিঝিলের ডিসিসিআই অডিটোরিয়ামে আয়োজিত ‘২০২৬ অর্থবছরের দ্বি-বার্ষিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি: প্রেক্ষিত রাজস্ব ও মুদ্রানীতি এবং বেসরকারিখাতের প্রত্যাশা’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে নীতিনির্ধারক পর্যায়ের পক্ষ থেকে এসব তথ্য জানানো হয়। সেমিনারে দেশের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী, অর্থনীতিবিদ, গবেষক এবং বিভিন্ন খাতের নীতিনির্ধারকরা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, দায়িত্ব গ্রহণের প্রারম্ভে দেশের কোনো কোনো জ্বালানি খাতের রিজার্ভ মাত্র ১৫ থেকে ১৭ দিনের মধ্যে নেমে এসেছিল। সরকারের কার্যকর পদক্ষেপে বর্তমানে সেই রিজার্ভ বাড়িয়ে এক মাসে উন্নীত করা সম্ভব হয়েছে। পর্যায়ক্রমে দেশের প্রতিটি জ্বালানি খাতের বিপরীতে কমপক্ষে তিন মাসের রিজার্ভ নিশ্চিত করার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে প্রশাসন কাজ করে যাচ্ছে। এ লক্ষ্যে জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খল শক্তিশালী করতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগের পারস্পরিক সম্পর্কের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বক্তারা বলেন, দেশের অর্থনীতিকে টেকসই গতিশীলতায় ফিরিয়ে আনতে বিনিয়োগের বিকল্প নেই। দেশে অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত না হলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থাও অর্জন করা সম্ভব নয়। অতীতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মূলত বেসরকারি খাতকেন্দ্রিক ছিল। বেসরকারি খাতের ওপর ভর করেই দেশের অর্থনীতি পরিচালিত হবে এবং সরকারের মূল দায়িত্ব হবে প্রয়োজনীয় সহায়ক পরিবেশ ও নীতিগত সুবিধা নিশ্চিত করা। ব্যবসার খরচ কমাতে কাস্টমস, বন্দর কর্তৃপক্ষ এবং বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদের নিয়ে যৌথ বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এসব বৈঠকে পণ্য আমদানির পর কার্গো খালাসের সময়সীমা নির্ধারণ এবং কাস্টমস ও বন্দরের কার্যক্রম নির্দিষ্ট দিনের মধ্যে সম্পন্ন করার বিষয়ে ইতোমধ্যে সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়েছে।
অর্থনৈতিক বহুমুখীকরণের অংশ হিসেবে ঐতিহ্যগত খাতের পাশাপাশি সেবা ও সৃজনশীল খাতের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মেট্রোপলিটান সিটির থিয়েটার ডিস্ট্রিক্ট বা সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলোকে ঘিরে টিকিট বিক্রি, খুচরা ব্যবসা, রেস্তোরাঁ, আইনি সেবা, ডিজাইনার শপ এবং নানামুখী অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের যে বিস্তৃতি ঘটে, বাংলাদেশেও ঠিক সেভাবে থিয়েটার, চলচ্চিত্র এবং খেলাধুলাকে কেন্দ্র করে বিশাল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গড়ে তোলা সম্ভব। এই খাতগুলো দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় জিডিপির সরাসরি হিসেবে অবমূল্যায়ন বা মনিটাইজ করা হয়নি। নতুন উদ্যোগের মাধ্যমে এই সম্ভাবনাময় খাতগুলোতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিসর আরও বিস্তৃত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া প্রচলিত আনুষ্ঠানিক আর্থিক খাতের মূলধন বা ঋণ সুবিধা থেকে দীর্ঘকাল ধরে বঞ্চিত সাধারণ মানুষকে নতুন উদ্যোগের মাধ্যমে অর্থনীতির মূলধারায় সম্পৃক্ত করার প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে।
সেমিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআরআই) চেয়ারম্যান ড. জাইদি সাত্তার, ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স (আইসিসি) বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান এবং পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ও ব্র্যাকের চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান। তাঁরা দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, রাজস্ব নীতি, মুদ্রানীতি এবং বেসরকারি খাতের দীর্ঘমেয়াদি প্রত্যাশা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন এবং নীতিগত সংস্কারের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।