আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রশাসন ইরানের সঙ্গে কোনো কূটনৈতিক বা বাণিজ্যিক চুক্তিতে পৌঁছাতে এখনো প্রস্তুত নয় বলে মন্তব্য করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। দক্ষিণ ক্যারোলিনা অঙ্গরাজ্যে সফরের উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়ার প্রাক্কালে এয়ার ফোর্স ওয়ান বিমানে ওঠার আগে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এই মন্তব্য করেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, তেহরান সরকার চুক্তির প্রতি মৌখিকভাবে আগ্রহ প্রকাশ করলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে বাস্তবসম্মত ও সঠিক কোনো সমঝোতায় আসার মতো উপযুক্ত অবস্থানে তারা নেই।
চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র তেহরানের ওপর অর্থনৈতিক ও কৌশলগত চাপ আরও কঠোর করার নীতি গ্রহণ করেছে। ওয়াশিংটন বর্তমানে এই কঠোর ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে ইরানের ভঙ্গুর অর্থনীতির ওপর কী ধরনের সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়ে, তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। মার্কিন প্রশাসন মনে করছে, প্রায় ছয় মাসের দীর্ঘ সামরিক ও রাজনৈতিক সংঘাতের কারণে ইতোমধ্যে প্রবল চাপের মুখে থাকা ইরানি অর্থনীতি এই অতিরিক্ত নিষেধাজ্ঞার ফলে আরও বেশি অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে।
এর আগে গত বুধবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে একটি কঠোর অর্থনৈতিক পদক্ষেপের ঘোষণা দেন। ওই ঘোষণায় তেহরান সরকারকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সমর্থনদানকারী বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার ও বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক সংস্থার ওপর ব্যাপকভিত্তিক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং কঠোর পরিণতির কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়। মার্কিন কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, এই অর্থনৈতিক চাপের মূল লক্ষ্য হলো ইরানের নীতিনির্ধারকদের ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করা, যাতে তারা ওয়াশিংটনের শর্তাধle কোনো আলোচনায় বাধ্য হয়।
বর্তমান সংঘাতময় পরিস্থিতিতে ইরানের অভ্যন্তরে বহুমুখী অর্থনৈতিক ও সামরিক সংকট চরম আকার ধারণ করেছে বলে দাবি করেছে মার্কিন প্রশাসন। ট্রাম্পের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের ফলে দেশটির রাষ্ট্রীয় কোষাগার কার্যত শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে এবং সামরিক কাঠামোর ক্ষেত্রে তারা বড় ধরনের ঘাটতির মুখোমুখি হয়েছে। তিনি আরও দাবি করেন যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশটির নিয়মিত সামরিক বাহিনী, বিমানবাহিনী ও নৌবাহিনীর সক্ষমতা মারাত্মকভাবে সীমিত হয়ে পড়েছে এবং অর্থনৈতিক সংকটের কারণে রাষ্ট্রীয় কর্মীদের নিয়মিত বেতন-ভাতা প্রদানেও বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটছে। এছাড়া দেশটিতে মূল্যস্ফীতির হার চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে বলেও মার্কিন তরফ থেকে দাবি করা হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি এবং এর আশপাশের ভূখণ্ডগত অঞ্চলের ওপর মার্কিন সামরিক বাহিনীর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে বলে দাবি করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান এই আন্তর্জাতিক জলপথ এবং এর নিকটবর্তী স্থলভাগের ওপর ওয়াশিংটনের এই নিয়ন্ত্রণ পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা ও ভূরাজনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। মার্কিন প্রশাসনের এই অবস্থানের ফলে হরমুজ প্রণালি কেন্দ্র করে সৃষ্ট বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খলার ওপরও বাড়তি নজরদারি বজায় রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার এই চলমান দীর্ঘমেয়াদি ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্ব শুধু দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে পুরো মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর। হরমুজ প্রণালির মতো অতি সংবেদনশীল সামুদ্রিক বাণিজ্যপথে মার্কিন নিয়ন্ত্রণ এবং তেহরানের ওপর লাগাতার অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের কৌশল আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন উত্তেজনার জন্ম দিয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে দুই পক্ষের অনড় অবস্থানের কারণে নিকট ভবিষ্যতে কূটনৈতিক উপায়ে এই সংকটের স্থায়ী কোনো সমাধান অর্জিত হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা।