আন্তর্জাতিক ডেস্ক
দক্ষিণ কোরিয়ার সাবেক গোয়েন্দাপ্রধান চো তায়ে-ইয়ংয়ের কারাদণ্ডের মেয়াদ ১৮ মাস থেকে বাড়িয়ে আড়াই বছর (৩০ মাস) কারাদণ্ড দিয়েছেন দেশটির একটি আপিল আদালত। ২০২৪ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইউন সুক-ইওলের বিতর্কিত ও ব্যর্থ সামরিক আইন জারির প্রচেষ্টার প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকা এবং মিথ্যা তথ্য দেওয়ার দায়ে এই রায় দেওয়া হয়। সিউল হাইকোর্ট বুধবার এক শুনানিতে এই বর্ধিত সাজার আদেশ দেন।
আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স সার্ভিসের (এনআইএস) সাবেক পরিচালক চো তায়ে-ইয়ং রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনকালে রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা লঙ্ঘনের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ইউন সুক-ইওল স্বল্প সময়ের জন্য যে জরুরি সামরিক আইন ঘোষণা করেছিলেন, তার কয়েক দিনের মাথায় চো প্রকাশ্য বক্তব্যে দাবি করেন যে রাজনীতিকদের গ্রেপ্তারের কোনো নির্দেশনা তিনি পাননি। তবে বিচারিক তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে, সামরিক আইন জারির দিনই শীর্ষ রাজনীতিকদের আটকের পরিকল্পনার বিষয়ে তাকে সরাসরি অবহিত করা হয়েছিল। জানা সত্ত্বেও জনসমক্ষে অসত্য বক্তব্য দেওয়ায় আদালত এটিকে রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা প্রধান হিসেবে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপ বলে চিহ্নিত করেছেন।
দক্ষিণ কোরিয়ার জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা বিষয়ক সুনির্দিষ্ট আইনে গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের যে কোনো ধরনের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। আপিল আদালত রায়ে উল্লেখ করেন, শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা হিসেবে জাতীয় সংকটের মুহূর্তে এমন অসত্য তথ্য প্রচারের মাধ্যমে তিনি সরাসরি রাজনৈতিক বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন এবং আইনি বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘন করেন।
এর আগে দেশটির একটি নিম্ন আদালত চো তায়ে-ইয়ংকে মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়ার অভিযোগে ১৮ মাসের কারাদণ্ড দিয়েছিলেন। তবে ওই রায়ের বিরুদ্ধে বিশেষ কৌঁসুলির কার্যালয় থেকে আপিল করে সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড দাবি করা হয়েছিল। রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তি ছিল, জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থার প্রধান হিসেবে তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন এবং বিচার প্রক্রিয়াকে বিভ্রান্ত করেছেন।
মামলায় তার বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগও আনা হয়েছিল। অভিযোগ ছিল, সামরিক আইনের আওতায় সংসদ সদস্য ও বিরোধী দলের শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তারের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার কথা জানার পরও তিনি তাৎক্ষণিকভাবে জাতীয় সংসদকে বিষয়টি অবহিত করেননি। তবে নিম্ন আদালতের মতো আপিল আদালতও তাকে দায়িত্বে অবহেলার এই নির্দিষ্ট অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দিয়েছেন। আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, বিদ্যমান আইনি কাঠামো ও পরিস্থিতির আলোকে ওই মুহূর্তে জাতীয় সংসদকে তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি জানানো তার জন্য বাধ্যতামূলক প্রশাসনিক দায়িত্বের মধ্যে পড়ত কি না, তা আইনগতভাবে দ্ব্যর্থহীনভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৪ সালের ব্যর্থ সামরিক আইন জারির ঘটনায় জড়িত উচ্চপদস্থ সামরিক, বেসামরিক ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনার প্রক্রিয়ায় এই বর্ধিত সাজার রায়টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সাবেক প্রেসিডেন্ট ইউন সুক-ইওলের বিরুদ্ধে চলমান সাংবিধানিক ও আইনি পদক্ষেপের পাশাপাশি তার মন্ত্রিসভা ও শীর্ষ নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের ভূমিকাও দেশটির বিচার বিভাগের কঠোর নজরদারিতে রয়েছে। গোয়েন্দা প্রধানের এই বর্ধিত দণ্ড দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা রক্ষা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ সমুন্নত রাখার ক্ষেত্রে একটি দৃষ্টান্তমূলক বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।