আইন আদালত ডেস্ক
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের বৈধতা চ্যালেঞ্জ এবং আসন্ন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ঘোষিত তফসিল স্থগিত চেয়ে হাইকোর্টে খারিজ হওয়া রিটের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আবেদন করা হয়েছে। আজ বুধবার সুপ্রিম কোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় আবেদনকারী আইনজীবী মো. ইউনুছ আলী আকন্দ এই আবেদন দাখিল করেন। আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতে দ্রুত এ বিষয়ে শুনানির জন্য উপস্থাপন করা হবে বলে আবেদনকারী সূত্রে জানা গেছে।
এর আগে গতকাল মঙ্গলবার বিচারপতি খিজির আহমেদ চৌধুরী ও বিচারপতি এ এফ এম সাইফুল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ প্রাথমিক শুনানি শেষে রিট আবেদনটি সরাসরি খারিজ করে আদেশ দেন। ওই আদেশে আদালত পর্যবেক্ষণ দেন যে সংবিধান সংশোধনের বিষয়টি জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটির এখতিয়ারভুক্ত এবং নির্বাচন কমিশন আইন অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছে। হাইকোর্টের এই আদেশের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ হয়ে আজ আপিল বিভাগের শরণাপন্ন হলেন রিটকারী আইনজীবী।
গত ১৩ আগস্ট সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের সাংবিধানিক বৈধতা এবং নির্বাচন কমিশন ঘোষিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিলের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে জনস্বার্থে এই রিট দায়ের করা হয়েছিল। রিট আবেদনে ৭০ অনুচ্ছেদ কেন সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও বাতিল ঘোষণা করা হবে না এবং নির্বাচন কমিশনের তফসিল কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না—তা জানতে চেয়ে রুল জারির আর্জি জানানো হয়। একই সঙ্গে রুল বিচারাধীন থাকা অবস্থায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের কার্যক্রম স্থগিত রাখার অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশনা চাওয়া হয়েছিল।
আদালতে শুনানিকালে রিটকারী আইনজীবী যুক্তি তুলে ধরে বলেন, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের কারণে কোনো সংসদ সদস্য নিজ দলের সিদ্ধান্তের বাইরে স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ বা ভোট দিতে পারেন না। এটি সংসদ সদস্যদের স্বাধীন দায়িত্ব পালনের পথে বাধা এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার পরিপন্থি। বিশেষ করে গোপন ব্যালটের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদ সদস্যরা যাতে দলের নির্দেশনার বাইরে স্বাধীনভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন, সেই সাংবিধানিক নিশ্চয়তা থাকা প্রয়োজন।
অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল এবং ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেলরা শুনানিতে রিটের তীব্র বিরোধিতা করেন। রাষ্ট্রপক্ষ যুক্তি উপস্থাপন করে জানায়, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংবিধানের একটি স্বীকৃত ও মৌলিক বিধান, যা সংসদের স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া পূর্বেও এ সংক্রান্ত আবেদন উচ্চ আদালতে খারিজ হয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা আদালতকে অবহিত করেন যে সংবিধানের কোনো বিধান সংশোধন বা পর্যালোচনার এখতিয়ার জাতীয় সংসদের এবং ইতিমধ্যে এ সংক্রান্ত বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠিত হয়েছে। আদালত রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তি আমলে নিয়ে রিটটি সরাসরি খারিজ করে দেন।
নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, আগামীকাল বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত জাতীয় সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এবারের নির্বাচনে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে একাধিক প্রার্থী মনোনয়ন পাওয়ায় ১৯৯১ সালের পর দীর্ঘ বিরতি দিয়ে সংসদের গোপন ব্যালটে ভোটগ্রহণের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে রাজনৈতিক ও আইনি অঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক বিদ্যমান। ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো সংসদ সদস্য নিজ দল থেকে পদত্যাগ করলে কিংবা সংসদে দলের বিপক্ষে ভোট দিলে তার সংসদীয় আসন শূন্য হয়ে যায়। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে এই বিধানের প্রভাব এবং সংসদ সদস্যদের স্বাধীন ভোটাধিকারের বিষয়টি নিয়ে আপিল বিভাগে নতুন করে আবেদন হওয়ায় পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়ার ওপর সর্বোচ্চ আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দৃষ্টি এখন কেন্দ্রীভূত হয়েছে।