আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা, সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুড ও যুক্তরাষ্ট্রের বেঞ্চমার্ক ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট—উভয় তেলেরই মূল্যবৃদ্ধির মধ্য দিয়ে লেনদেন পরিচালিত হয়। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি জ্বালানি সরবরাহ চেইনে প্রভাব ফেলতে পারে—এমন পূর্বাভাস থেকেই মূলত বিশ্ববাজারে তেলের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা তৈরি হয়েছে।
বাজারের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ২৭ সেন্ট বা প্রায় ০ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়ে ৯১ দশমিক ১৪ মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। এর আগের কার্যদিবসেও পণ্যটির দাম বিগত জুলাই মাসের শেষ ভাগের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে অবস্থান করছিল। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুডের দাম ৪২ সেন্ট বৃদ্ধি পেয়ে ব্যারেলপ্রতি ৮৫ দশমিক ০৪ ডলারে দাঁড়ায়। যদিও লেনদেনের শুরুর ভাগে একপর্যায়ে ডব্লিউটিআই তেলের দাম ১ শতাংশেরও বেশি বেড়ে প্রতি ব্যারেল ৮৫ দশমিক ৩৭ ডলারে উন্নীত হয়েছিল।
বিশ্লেষকদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান কূটনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে বাজারে সরবরাহ ঘাটতির উদ্বেগ প্রকট আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে সংঘাত নিরসনে কার্যকর কোনো যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হওয়া এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর অনড় ও কঠোর অবস্থানের কারণে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের সামগ্রিক পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল রূপ নিয়েছে। এছাড়া বিদ্যমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর অনাগ্রহ আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে দিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলটি বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি তেল উৎপাদন ও রপ্তানিকারক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীসহ বিভিন্ন প্রধান বাণিজ্যিক জলপথ দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে পরিবাহিত হয়। এই অঞ্চলের কোনো অংশে সরাসরি সংঘাত সৃষ্টি হলে অথবা সামুদ্রিক পরিবহন পথ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়লে বিশ্বজুড়ে জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ বিঘ্নিত হতে পারে। বিনিয়োগকারীরা আশঙ্কা করছেন, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে উত্তোলন ও পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে, যা সরবরাহ চেইনে বড় ধরনের সংকট তৈরি করবে।
জ্বালানি তেলের এই ধারাবাহিক মূল্যবৃদ্ধির বহুমুখী প্রভাব পড়তে পারে সামগ্রিক বৈশ্বিক অর্থনীতিতে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধি পেলে বিশ্বজুড়ে পরিবহন ও উৎপাদন খাতের ব্যয় একযোগে বেড়ে যায়। ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন করে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়, যা আমদানি-নির্ভর উন্নয়নশীল দেশগুলোর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং সামষ্টিক অর্থনীতির ভারসাম্যের ওপর বড় ধরনের প্রতিকূল প্রভাব ফেলতে পারে। বর্তমান পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি ও তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর পরবর্তী নীতিগত সিদ্ধান্তের ওপরই জ্বালানি বাজারের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে।