নিজস্ব প্রতিবেদক
সারা দেশে চলাচলকারী ব্যাটারিচালিত রিকশাকে সুনির্দিষ্ট নীতিমালার অধীনে নিবন্ধনের (রেজিস্ট্রেশন) আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। তবে নিবন্ধনের ক্ষেত্রে ব্যাটারি রিচার্জে জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের ওপর চাপ কমাতে সৌর বিদ্যুৎ (সোলার পাওয়ার) ব্যবহারের বাধ্যতামূলক শর্ত নির্ধারণ করা হচ্ছে। সোমবার সচিবালয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম এই সিদ্ধান্তের কথা জানান।
প্রতিমন্ত্রী জানান, ব্যাটারিচালিত রিকশার অনিয়ন্ত্রিত চলাচল ও অবৈধ বিদ্যুৎ ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ন্ত্রণে আনতে এই সিদ্ধান্ত বিবেচনা করা হচ্ছে। এখন থেকে সৌর বিদ্যুতের মাধ্যমে ব্যাটারি চার্জ করার কার্যকর ব্যবস্থা থাকলেই কেবল সংশ্লিষ্ট রিকশাকে চলাচলের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক নিবন্ধন দেওয়া হবে। সৌর বিদ্যুতের বাইরে অন্য কোনো সাধারণ বা বাণিজ্যিক বিদ্যুৎ সংযোগ ব্যবহার করে রিচার্জ করা হলে সংশ্লিষ্ট যানবাহনকে কোনোভাবেই নিবন্ধনের আওতায় আনা হবে না।
দেশে গত কয়েক বছর ধরে বিভাগীয় শহর, জেলা-উপজেলা এবং গ্রামীণ এলাকায় তিন চাকার ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজি বাইকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। যোগাযোগ ব্যবস্থার সহজলভ্যতা ও বিপুল সংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হলেও যানবাহনগুলোর নিয়ন্ত্রণ ও বিদ্যুৎ ব্যবহার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা জটিলতা চলছিল। বিশেষ করে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ বা আবাসিক সংযোগ থেকে ঝুঁকিপূর্ণভাবে এসব রিকশার ব্যাটারি চার্জ দেওয়ার অভিযোগ ওঠে নিয়মিত। এতে জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হওয়ার পাশাপাশি সরকার বিপুল অঙ্কের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা চিহ্নিত করে আসছিলেন।
প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, “ব্যাটারিচালিত রিকশাগুলোকে একটি নিয়মতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসতে রেজিস্ট্রেশনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। তবে শর্ত একটাই—এগুলোর ব্যাটারি রিচার্জে বাধ্যতামূলকভাবে সৌর শক্তি ব্যবহার করতে হবে। জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুতের অপচয় বা অবৈধ ব্যবহার রোধে সৌর বিদ্যুতের বাইরে অন্য কোনো মাধ্যমে চার্জ দেওয়া রিকশাকে নিবন্ধন দেওয়া হবে না।”
নীতিনির্ধারকদের মতে, ব্যাটারিচালিত যানবাহনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা গেলে জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ সাশ্রয় হবে এবং পরিবেশবান্ধব যাতায়াত ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে অবৈধ চার্জিং গ্যারেজগুলোর মাধ্যমে বিদ্যুৎ চুরির প্রবণতা রোধ করা যাবে। সৌর বিদ্যুতভিত্তিক বিশেষায়িত চার্জিং স্টেশন স্থাপন বা রিকশায় সরাসরি সোলার প্যানেল সংযোজনের মতো প্রযুক্তিগত বিষয়গুলো নিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও অংশীজনদের সঙ্গে সমন্বয় করে বিস্তারিত রূপরেখা চূড়ান্ত করা হবে।
যোগাযোগ ও নগর পরিকল্পনা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ব্যাটারিচালিত রিকশাকে নিবন্ধনের আওতায় আনার উদ্যোগটি শৃঙ্খলা ফেরাতে সহায়ক হবে। তবে মাঠপর্যায়ে সৌর শক্তির মাধ্যমে রিচার্জ নিশ্চিত করতে পর্যাপ্ত সৌর চার্জিং স্টেশন স্থাপন, কারিগরি সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সহজ শর্তে চালক ও মালিকদের কাছে প্রযুক্তি পৌঁছে দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে সৌর চার্জিংয়ের সঠিক তদারকি ও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে স্থানীয় সরকার প্রশাসন এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সমন্বিত নজরদারি জরুরি।
সরকারের এই নতুন সিদ্ধান্তের ফলে দেশব্যাপী চলাচলকারী লাখ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশার নিয়ন্ত্রণ, বিদ্যুৎ সাশ্রয় এবং পরিবেশবান্ধব টেকসই যোগাযোগ অবকাঠামো নির্মাণে একটি কার্যকর কাঠামোর সূচনা হবে বলে আশা প্রকাশ করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ খুব দ্রুত এ সংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ নির্দেশিকা ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া প্রকাশ করবে বলে জানা গেছে।