আন্তর্জাতিক ডেস্ক
দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বার্ষিক যৌথ সামরিক মহড়া ‘উলচি ফ্রিডম শিল্ড’-এর পরিসর তাৎক্ষণিকভাবে কমিয়ে আনার নির্দেশ দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মহড়ার অতিরিক্ত আর্থিক ব্যয় এবং ওয়াশিংটনের ইরানবিরোধী পদক্ষেপে সিউলের অসহযোগিতার কারণ দেখিয়ে মহড়া শুরুর মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগনকে এই নির্দেশনা দেওয়া হয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের এমন ঘোষণার পরও নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী পূর্বঘোষিত মহড়া শুরু করেছে দক্ষিণ কোরিয়ার সশস্ত্র বাহিনী।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জানান, মহড়াটি সম্পূর্ণ বাতিল করার মতো পর্যাপ্ত সময় হাতে ছিল না। তবে এই প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণের বিষয়ে নিজের অসন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি। একই সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার শীর্ষ নেতা কিম জং–উনের সঙ্গে নিজের কূটনৈতিক সম্পর্কের বিষয়টি ইতিবাচকভাবে তুলে ধরেন ট্রাম্প। বিপরীতে তেহরানের পরমাণু কর্মসূচি প্রতিহত করার ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের প্রচেষ্টায় সমর্থন না দেওয়ায় দক্ষিণ কোরিয়ার কঠোর সমালোচনা করেন তিনি।
নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী, ১৭ আগস্ট থেকে ২৭ আগস্ট পর্যন্ত দুই দেশের এই যৌথ সামরিক মহড়া অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। উত্তর কোরিয়ার সম্ভাব্য সামরিক আগ্রাসন প্রতিরোধ ও প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি জোরদারের লক্ষ্যে আয়োজিত এ বছরের অনুশীলনে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রায় ১৮ হাজার সেনা সদস্য অংশ নিচ্ছেন। দক্ষিণ কোরিয়ার জয়েন্ট চিফস অব স্টাফ জানিয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক মন্তব্য না করলেও মহড়াটি যথারীতি পরিচালিত হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে সিউলের প্রেসিডেন্সিয়াল কার্যালয়, প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং ওয়াশিংটনের হোয়াইট হাউস তাৎক্ষণিকভাবে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরেই ওয়াশিংটন ও সিউলের যৌথ মহড়াকে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি এবং যুদ্ধপ্রস্তুতি হিসেবে আখ্যায়িত করে আসছে উত্তর কোরিয়া। মহড়াকে কেন্দ্র করে কোরীয় উপদ্বীপে উত্তেজনা বৃদ্ধির ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি জাপান সাগরের দিকে স্বল্পপাল্লার একাধিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালিয়েছে পিয়ংইয়ং। সামরিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা, আকস্মিক এ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে নতুন করে কূটনৈতিক আলোচনার পথ তৈরি করার প্রয়াস থাকতে পারে, যদিও এর দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত কার্যকারিতা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী মহলে দক্ষিণ কোরিয়ায় মোতায়েন থাকা সাড়ে ২৮ হাজার মার্কিন সেনার ব্যয়ভার বণ্টন নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের এই মহড়ার কাঠামোগত পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। মাঠপর্যায়ের সরাসরি সমরাস্ত্র ব্যবহারের চেয়ে সাইবার নিরাপত্তা, ড্রোন প্রযুক্তি ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষায় কম্পিউটারভিত্তিক সিমুলেশন প্রশিক্ষণের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
কোরীয় উপদ্বীপের আঞ্চলিক নিরাপত্তা সমীকরণ বর্তমানে ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে আরও জটিল রূপ ধারণ করেছে। মার্কিন সামরিক বিশ্লেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার ও সাইবার অভিযানের বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করছে পিয়ংইয়ং। পাশাপাশি উত্তর কোরিয়ার দূরপাল্লার আন্তমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডের নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও নতুন কৌশলগত উদ্বেগ তৈরি করেছে। ফলে মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই সিদ্ধান্ত পূর্ব এশিয়ার সামগ্রিক ভূরাজনীতি ও ওয়াশিংটন-সিউল সামরিক মৈত্রীতে কী ধরনের প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে গভীর পর্যবেক্ষণ চলছে।