আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যুদ্ধবিধ্বস্ত ইয়েমেনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় তাইজ প্রদেশে সরকারি বাহিনী ও সশস্ত্র হুথি বিদ্রোহীদের মধ্যে তীব্র সংঘর্ষ ও ড্রোন হামলায় গত ৪৮ ঘণ্টায় দুই শতাধিক হুথি যোদ্ধা নিহত হয়েছেন। রাজধানী সানার সামরিক ও চিকিৎসা সূত্রগুলো এই ব্যাপক প্রাণহানির খবর নিশ্চিত করেছে। নিহতদের সিংহভাগই বিদ্রোহী গোষ্ঠীর গুরুত্বপূর্ণ ‘আল-সামাদ ব্রিগেড’-এর সদস্য বলে জানা গেছে। গত কয়েক দিনে রাজধানী সানার বিভিন্ন হাসপাতালে বিপুলসংখ্যক মরদেহ ও আহতদের নিয়ে আসা হয়েছে, যা সাম্প্রতিক সময়ে ওই অঞ্চলে সংঘাতের তীব্রতা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়।
সামরিক সূত্রের বরাতে জানা গেছে, কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তাইজ প্রদেশের বিভিন্ন ফ্রন্টে দুপক্ষের মধ্যে ব্যাপক গুলিবিনিময় ও ড্রোন হামলা পরিচালিত হয়। সরকারি বাহিনীর সমন্বিত প্রতিরোধ ও পাল্টা আক্রমণে হুথি বিদ্রোহীরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ে। বিশেষ করে তাইজের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় ফ্রন্টগুলোতে তীব্র সংঘর্ষ চলাকালে লক্ষ্যভিত্তিক ড্রোন হামলায় হুথিদের গুরুত্বপূর্ণ একটি ইউনিটের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। আহত বহু যোদ্ধাকে সানার সামরিক ও বেসামরিক চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোতে ভর্তি করা হয়েছে, যার ফলে হাসপাতালগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে।
এই বিশাল ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠে মাঠপর্যায়ে নিজেদের অবস্থান পুনরুদ্ধার করতে হুথি বিদ্রোহীরা নতুন করে সামরিক শক্তি বৃদ্ধির উদ্যোগ নিয়েছে। তাইজ শহরের পশ্চিমে অবস্থিত কৌশলগত আল-বারহ ফ্রন্টে ইতিমধ্যে অতিরিক্ত যোদ্ধা ও সামরিক সরঞ্জাম পাঠানো শুরু হয়েছে। নতুন করে মোতায়েন করা এই সেনাদলে হুথিদের এলিট বাহিনী, বিশেষ কমান্ডো ইউনিট এবং সাধারণ মোবিলাইজেশন ইউনিটের সদস্যরা অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এই অতিরিক্ত সেনা মোতায়েনের মূল উদ্দেশ্য হলো আল-বারহ অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা এবং সরকারি বাহিনীর অগ্রযাত্রাকে প্রতিহত করে পুনরায় আক্রমণের সূচনা করা।
যোদ্ধাসংকট কাটিয়ে উঠতে হুথি নেতৃত্ব তাদের নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন প্রদেশের কারাগার থেকে সাধারণ ও দাগি বন্দিদের মুক্তি দিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্যমতে, সা’দা, হাজ্জাহ ও রাজধানী সানার কারাগারগুলো থেকে ইতোমধ্যে প্রায় ৮৫০ জন বন্দি ও আটক ব্যক্তিকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। এই তালিকায় সাধারণ অপরাধে অভিযুক্তদের পাশাপাশি বিভিন্ন গুরুতর ফৌজদারি ও মাদক মামলার আসামিরাও রয়েছেন। এ ছাড়া ধামার প্রদেশের কেন্দ্রীয় কারাগারগুলো থেকে আরও প্রায় এক হাজার চারশত বন্দিকে মুক্তি দেওয়ার প্রশাসনিক প্রক্রিয়া চলছে।
কারাগার থেকে মুক্তির শর্ত হিসেবে বন্দিদের ওপর যুদ্ধক্ষেত্রে সরাসরি অংশ নেওয়ার কঠোর শর্ত আরোপ করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে তাদের কাছ থেকে বাধ্যতামূলক অঙ্গীকারনামা নেওয়া হচ্ছে এবং কিছু বন্দিকে আনুষ্ঠানিক চুক্তি, আর্থিক প্রণোদনা ও নিয়মিত ভাতার প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে। এমনকি আর্থিক ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে কারাবন্দি হওয়া ব্যক্তিদের বকেয়া ঋণ পরিশোধের প্রতিশ্রুতি দিয়েও সশস্ত্র লড়াইয়ে যুক্ত করা হচ্ছে। তীব্র সামরিক সংকটের মুখে এই ধরনের কৌশল যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলটিতে পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
তবে সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতির কারণে নিরপেক্ষ কোনো পর্যবেক্ষক বা আন্তর্জাতিক সংস্থার পক্ষ থেকে এই হতাহতের সংখ্যা এবং বন্দি মুক্তির তথ্যের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ইয়েমেনে দীর্ঘদিন ধরে চলা এই অচলাবস্থা এবং নতুন করে সেনা মোতায়েনের ফলে মানবিক সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করতে পারে বলে পর্যবেক্ষক মহল মনে করছে।