রাজধানী ডেস্ক
রাজধানী ঢাকা ও এর পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন এলাকায় মৃদু মাত্রার একটি ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। সোমবার (১৭ আগস্ট) ভোর ৫টা ৩২ মিনিটে এই ভূকম্পন অনুভূত হয়। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা কেন্দ্র জানিয়েছে, রিখটার স্কেলে এই ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৩ দশমিক শূন্য। এর উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকা থেকে প্রায় ৪৭ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে অবস্থিত নরসিংদী জেলার শিবপুর এলাকা। ভোরবেলায় অনুভূত হওয়া এই মৃদু ঝাঁকুনিতে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো ধরনের জানমালের ক্ষয়ক্ষতি কিংবা হতাহতের তথ্য পাওয়া যায়নি।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের সহকারী আবহাওয়াবিদ ফারজানা সুলতানা স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ভূকম্পনটির কেন্দ্র ছিল ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার গভীরে। রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত প্রধান ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের সিসমোমিটারে এটি মৃদু মাত্রার বা হালকা কম্পন হিসেবে নথিভুক্ত হয়। ভোরবেলা যখন নগরীর অধিকাংশ মানুষ ঘুমন্ত অবস্থায় ছিলেন, তখন হঠাৎ কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী এই মৃদু কম্পনে অনেকেই জেগে ওঠেন। রাজধানী ছাড়াও গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ এবং নরসিংদীর বিস্তীর্ণ অঞ্চলে এই মৃদু কম্পন অনুভূত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নরসিংদী ও এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলটি ভূতাত্ত্বিকভাবে মধুপুর ফল্ট এবং স্থানীয় সক্রিয় চ্যুতিরেখার কাছাকাছি অবস্থিত। এ ধরনের স্থানীয় চ্যুতিরেখাগুলো মাঝে মাঝে সক্রিয় হয়ে উঠলে মৃদু বা মাঝারি ধরনের কম্পন সৃষ্টি হয়ে থাকে। রিখটার স্কেলে ৩ মাত্রার ভূমিকম্পকে সাধারণত অত্যন্ত মৃদু বা ‘মাইনর’ ক্যাটাগরির অন্তর্ভুক্ত করা হয়, যা ভূপৃষ্ঠে বড় কোনো কাঠামোগত ক্ষতি সাধনে সক্ষম নয়। তবে উৎপত্তিস্থল অগভীর এবং ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চল বা রাজধানীর নিকটবর্তী হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষণিকের জন্য স্পষ্ট ঝাঁকুনি ও ভীতি সৃষ্টি হয়।
ভূতাত্ত্বিক ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে ভারতীয়, ইউরেশীয় এবং বার্মিজ প্লেটের মিলনস্থলে অবস্থিত হওয়ায় এটি অন্যতম সক্রিয় ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চল। বিশেষ করে দেশের উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ডাউকি ফল্ট ও পূর্বাঞ্চলের টেকটনিক প্লেটের চাপ প্রতিনিয়ত বাড়ছে। গত কয়েক বছরে ঢাকা, নরসিংদী, দোহার, সিলেট ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে ঘন ঘন মৃদু থেকে মাঝারি মাত্রার কম্পন অনুভূত হচ্ছে। গবেষকরা মনে করেন, এই ধরনের ঘন ঘন ছোট কম্পন মাটির নিচের ভূতাত্ত্বিক প্লেটের শক্তি সঞ্চয় ও সক্রিয়তার ইঙ্গিত বহন করে। বড় ধরনের ভূমিকম্পের ঝুঁকি মোকাবেলায় এসব ঘটনাকে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি।
এদিকে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) নগর পরিকল্পনাবিদরা বারবার সতর্ক করে আসছেন যে, ঢাকা শহরের অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং ঘনবসতিপূর্ণ বহুতল ভবনগুলো মাঝারি থেকে বড় মাত্রার ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে চরম ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) যথাযথভাবে প্রতিপালন করা এবং পুরনো ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোর ভূমিকম্প সহনশীলতা যাচাই (রেট্রোফিটিং) করা এখন সময়ের দাবি।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এবং ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের পক্ষ থেকে ভূমিকম্পকালীন করণীয় বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। সংস্থাগুলোর নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ভূকম্পন অনুভূত হলে আতঙ্কিত না হয়ে শান্ত থাকা, ভবনের ভেতরে থাকলে শক্ত টেবিল বা বিমের নিচে অবস্থান নেওয়া (‘ড্রপ, কভার অ্যান্ড হোল্ড অন’ পদ্ধতি অনুসরণ করা), লিফট ব্যবহার না করে সিঁড়ি দিয়ে খোলা জায়গায় বের হয়ে আসা এবং গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল সংযোগ দ্রুত বন্ধ করে দেওয়া উচিত।
রাজধানীর আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সোমবার ভোরের কম্পনের পর সংশ্লিষ্ট সব এলাকায় নজরদারি রাখা হয়েছে এবং কোথাও কোনো অপ্রত্যাশিত দুর্ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।