আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকা সত্ত্বেও দক্ষিণ লেবাননের বিভিন্ন এলাকায় সামরিক অভিযান ও তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী। সম্প্রতি দেশটির বিন্ত জবেইল জেলার হাদাথা শহরে ইসরায়েলি সেনাদের গুলিবর্ষণ ও সামরিক যান চলাচলের নতুন ঘটনা স্থানীয় পর্যায়ে তীব্র উত্তেজনা তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক মহলের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও এ ধরনের ধারাবাহিক সামরিক উপস্থিতি ও অভিযান লেবাননের সার্বিক নিরাপত্তা ও বেসামরিক নাগরিকদের স্বাভাবিক জীবনে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা ডেকে এনেছে।
লেবাননের সরকারি সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, বিন্ত জবেইল জেলার হাদাথা শহরের পশ্চিমাঞ্চলে ইসরায়েলি সেনারা স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র দিয়ে গুলিবর্ষণ করেছে। একই সঙ্গে কয়েকটি সামরিক যান শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও বিভিন্ন অংশে টহল দেয়। আকস্মিক এই সামরিক পদক্ষেপে ওই অঞ্চলের সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। যুদ্ধবিরতির শর্ত অনুযায়ী সংঘাতপূর্ণ এলাকাগুলোতে সামরিক তৎপরতা বন্ধ থাকার কথা থাকলেও মাঠপর্যায়ে এর ধারাবাহিক লঙ্ঘন দেখা যাচ্ছে।
চলতি বছরের ২ মার্চ থেকে লেবাননে ব্যাপক মাত্রায় বিমান ও স্থল অভিযান শুরু করে ইসরায়েলি বাহিনী। বিশেষ করে দক্ষিণ লেবাননের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সীমান্তসংলগ্ন শহর ও গ্রামগুলোতে কঠোর সামরিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়। ওই সময় ইসরায়েলি বিমান হামলায় হাজার হাজার আবাসিক ও বেসামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। লেবানন সরকারের হিসাব অনুযায়ী, সেই সময়ে চলা তীব্র সংঘাতের কারণে ১০ লাখেরও বেশি মানুষ নিজেদের বাড়িঘর ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেতে বাধ্য হন, যা দেশটিতে একটি মানবিক সংকটের সৃষ্টি করে।
পরবর্তীকালে সংঘাত নিরসনে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে গত ১৭ এপ্রিল লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর হয়। সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়া রোধ করতে পরবর্তীতে কয়েক দফায় এই চুক্তির মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়। তবে আনুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি বলবৎ থাকলেও ইসরায়েলি বাহিনীর পক্ষ থেকে নিয়মিত বিরতিতে অভিযান ও আকাশপথে নজরদারি চালানোর অভিযোগ রয়েছে। অতি সম্প্রতি ১৫ আগস্ট ভোরেও লেবাননের কয়েকটি কৌশলগত স্থানে বিমান হামলার খবর পাওয়া যায়, যা পূর্ববর্তী যুদ্ধবিরতি চুক্তির কার্যকারিতাকে সরাসরি প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২ মার্চ অভিযান শুরুর পর থেকে ইসরায়েলি হামলায় দেশটিতে এ পর্যন্ত ৪ হাজার ৩৪৬ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এছাড়া আহতের সংখ্যা কয়েক হাজার ছাড়িয়েছে। ক্রমাগত সামরিক তৎপরতা দেশটির ভঙ্গুর অর্থনীতি, স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও অবকাঠামোর ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধবিরতি চলাকালীন দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি বাহিনীর এমন ক্রমাগত অনুপ্রবেশ ও গুলিবর্ষণের ঘটনা অঞ্চলটিকে আবারও পূর্ণমাত্রার সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে। এতে করে বাস্তুচ্যুত মানুষের নিজ নিজ এলাকায় ফিরে যাওয়া আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ ও যুদ্ধবিরতির শর্তাবলী কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা না গেলে পুরো মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা চরম হুমকির মুখে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।