আন্তর্জাতিক ডেস্ক
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বার্তা, সামরিক রণতরী মোতায়েন কিংবা রাজনৈতিক ভাষণের মাধ্যমে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী দখল করা সম্ভব নয় বলে দৃঢ় অবস্থান জানিয়েছে ইরান। শনিবার ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘরিবাবাদী যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক অবস্থানের তীব্র বিরোধিতা করে এই মন্তব্য করেন। হরমুজ প্রণালীকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড হিসেবে ঘোষণার হুমকির জবাবে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি ওয়াশিংটনের এমন বক্তব্যকে বাস্তবতা-বিবর্জিত ও আন্তর্জাতিক আইন পরিপন্থী বলে অভিহিত করেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে কাজেম ঘরিবাবাদী স্পষ্ট ভাষায় জানান, কোনো ধরনের সামরিক প্রদর্শন বা রাজনৈতিক হুমকিতে ইরান তার সার্বভৌম অবস্থান থেকে সরে আসবে না। তিনি উল্লেখ করেন, কৌশলগত এই জলপথের নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনায় তেহরানের পূর্ণ সক্ষমতা রয়েছে। হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত রাখা কিংবা যেকোনো পরিস্থিতিতে তা নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে ইরানের নিজস্ব সার্বভৌম সিদ্ধান্ত এবং কর্তৃত্বের ওপর নির্ভরশীল। বাইরের কোনো শক্তি বলপ্রয়োগ বা একতরফা ঘোষণার মাধ্যমে এই অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারবে না।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালী বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান ধমনি হিসেবে বিবেচিত। পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের সংযোগস্থলে অবস্থিত এই সরু জলপথ দিয়ে বিশ্বের মোট সমুদ্রবাহিত জ্বালানি তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়। সৌদি আরব, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত এবং কাতারসহ মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান তেল ও গ্যাস উৎপাদনকারী দেশগুলোর রপ্তানি বাণিজ্য এই জলপথের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ফলে এই অঞ্চলে যেকোনো ধরনের উত্তেজনা বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারে তাৎক্ষণিক বড় ধরনের প্রভাব ফেলে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বৈরিতা এবং পারস্য উপসাগরে নিরাপত্তা সংকট নিরসনে হরমুজ প্রণালী সবসময়ই একটি বড় কৌশলগত উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন অনুযায়ী প্রণালীটি দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের অধিকার স্বীকৃত হলেও এর ভৌগোলিক অবস্থান এবং উপকূলীয় নিরাপত্তার ওপর ইরানের প্রভাব অত্যন্ত জোরালো। তেহরান দীর্ঘদিন ধরেই দাবি করে আসছে যে, বাইরের কোনো শক্তির উপস্থিতি ছাড়াই কেবল আঞ্চলিক দেশগুলোর সহযোগিতায় পারস্য উপসাগরীয় এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব।
কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের এই ধরনের কঠোর অবস্থানের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করতে পারে। বিশেষ করে প্রণালীটিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে বা কোনো ধরনের সামরিক সংঘাতের উপক্রম হলে তা আন্তর্জাতিক অপরিশোধিত তেলের মূল্যে অস্থিরতা সৃষ্টি করবে। একই সঙ্গে এই বিরোধ আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খলেও মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটাতে পারে, যার সামগ্রিক প্রভাব পড়বে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের ওপর। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে আন্তর্জাতিক আইন ও কূটনীতির পথে সমাধানের তাগিদ দিচ্ছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা।