অর্থ বাণিজ্য ডেস্ক
রপ্তানি পণ্যের প্রচলিত একক খাতের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নতুন সম্ভাবনাময় খাতের দিকে মনোযোগ দেওয়ার তাগিদ দিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেছেন, আসিয়ান অঞ্চলের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে দেশে একটি আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ও নির্ভরযোগ্য হালাল অর্থনীতি গড়ে তুলতে হবে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস)-এর আয়োজনে “আসিয়ান অঞ্চলে হালাল ইকোসিস্টেম: বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনা” শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
সেমিনারে বাণিজ্যমন্ত্রী উল্লেখ করেন, হালাল অর্থনীতি বর্তমানে কেবল খাদ্য ও পানীয় খাতের গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি খাদ্য, ওষুধ, প্রসাধনী, ফ্যাশন, পর্যটন, লজিস্টিকস, প্রযুক্তি, অর্থায়ন এবং আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশনের সমন্বয়ে গঠিত একটি বিশাল বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। রপ্তানি আয় বৃদ্ধি করতে হলে দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করা অত্যন্ত জরুরি।
তিনি আরও জানান, স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের বাণিজ্য সুবিধা অক্ষুণ্ণ রাখতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ), অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (পিটিএ) এবং অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি স্বাক্ষরের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রতি আস্থা বৃদ্ধি এবং নতুন বাজার সম্প্রসারণের জন্য একটি স্বাধীন ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হালাল সার্টিফিকেশন ব্যবস্থা গড়ে তোলা সময়ের দাবি।
আলোচনায় বক্তারা বলেন, বাংলাদেশের রপ্তানি খাত দীর্ঘকাল ধরে তৈরি পোশাকশিল্পের ওপর अत्यधिक মাত্রায় নির্ভরশীল। ভবিষ্যতের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে পণ্য এবং বাজার উভয় ক্ষেত্রেই বহুমুখীকরণ নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে উদীয়মান বৈশ্বিক হালাল বাজার বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনার এক বিশাল দুয়ার উন্মোচন করতে পারে। বর্তমান বিশ্বে খাদ্য ছাড়াও ওষুধ, প্রসাধনী, পর্যটন ও জীবনধারাভিত্তিক পণ্যে হালাল মানদণ্ডের চাহিদা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
মালয়েশিয়ার হালাল ইকোসিস্টেমকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে বক্তারা বলেন, দেশটি হালাল খাতকে শুধু একটি পণ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে উৎপাদন, গবেষণা, সার্টিফিকেশন, বিপণন ও রপ্তানি মিলিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ কাঠামোগত অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় রূপ দিয়েছে। বাংলাদেশের বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার, শক্তিশালী কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ খাত, ওষুধ শিল্প এবং চামড়া ও পোশাক খাতের দীর্ঘ অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে বৈশ্বিক হালাল সরবরাহ শৃঙ্খলে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করা সম্ভব।
সেমিনারে বাংলাদেশের হালাল খাতকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে পাঁচটি কৌশলগত অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে একটি আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য জাতীয় হালাল নিশ্চয়তা কাঠামো প্রণয়ন, আধুনিক পরীক্ষাগার ও লজিস্টিক সুবিধাসম্পন্ন বিশেষায়িত হালাল শিল্প ক্লাস্টার গড়ে তোলা, বিদ্যমান উৎপাদন খাতগুলোকে বিশ্বমানের উপযোগী করা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের (এসএমই) উদ্যোক্তাদের সম্পৃক্ত করা এবং কার্যকর অর্থনৈতিক কূটনীতির মাধ্যমে “বাংলাদেশ হালাল ব্র্যান্ড” বিশ্ববাজারে প্রতিষ্ঠিত করা।
বিআইআইএসএসের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল এ এস এম রেদওয়ানুর রহমানের স্বাগত বক্তব্যের মাধ্যমে শুরু হওয়া সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রতিষ্ঠানের গবেষণা পরিচালক ড. মাহফুজ কবীর। এছাড়া প্যানেল আলোচনায় ইসলামিক ফাউন্ডেশন এবং বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ধর্মীয় মূল্যবোধের পাশাপাশি পণ্যের সর্বোচ্চ মান, নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে হালাল অর্থনীতি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রপ্তানি খাতের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে। এর জন্য সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ এবং কার্যকর কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন জরুরি।