অর্থ বাণিজ্য ডেস্ক
বাংলাদেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে সরকারের সঙ্গে অংশীদার হিসেবে কাজ করার নতুন অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (অ্যামচেম)। মঙ্গলবার বাংলাদেশ সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎকালে সংগঠনটির নির্বাহী কমিটির একটি প্রতিনিধিদল এই অঙ্গীকার ব্যক্ত করে। অ্যামচেমের সভাপতি ও মাস্টারকার্ডের ভাইস প্রেসিডেন্ট সৈয়দ মোহাম্মদ কামালের নেতৃত্বে এই প্রতিনিধিদলটি সরকারের নীতি নির্ধারণী মহলের সঙ্গে দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ পরিবেশ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে।
সাক্ষাৎকালে অ্যামচেমের পক্ষ থেকে জানানো হয় যে, ১৯৯৬ সাল থেকে সংগঠনটি বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার করতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। পাশাপাশি একটি স্বচ্ছ, স্থিতিশীল, প্রতিযোগিতামূলক ও বিনিয়োগবান্ধব ব্যাবসায়িক পরিবেশ তৈরিতেও তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। সংগঠনটির সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলো সম্মিলিতভাবে বাংলাদেশের জাতীয় কর রাজস্বের ২০ শতাংশের বেশি অবদান রাখছে, যা দেশের অর্থনীতিতে তাদের সুদৃঢ় অবস্থানের বিষয়টি স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
বৈঠকে আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল আগামী দিনের বিনিয়োগ পরিকল্পনা ও সরকারের চলমান সংস্কার কার্যক্রম। অ্যামচেম জানায়, গত কয়েক বছরে তাদের সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশে পাঁচ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি বিনিয়োগ করেছে। বর্তমান ধারাবাহিকতা বজায় রেখে আগামী পাঁচ বছরে আরও পাঁচ বিলিয়ন মার্কিন ডলার নতুন বিনিয়োগ আনতে সহায়তা করার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য রয়েছে সংগঠনটির। এই লক্ষ্য অর্জনে তারা সরকারের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ ও নীতিগত সহায়তা কামনা করে। এছাড়া ২০২৬-২৭ অর্থবছরের সংস্কার প্যাকেজের আওতায় বিনিয়োগ সহজীকরণের লক্ষে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন ইতিবাচক পদক্ষেপের প্রশংসা করে অ্যামচেম।
বিনিয়োগের পথ সুগম করতে অনুমোদন ও লাইসেন্স প্রদানের সময়সীমা নির্ধারণ, সিঙ্গেল উইন্ডো ব্যবস্থা চালু, কর ও ভ্যাট প্রশাসনের ডিজিটালাইজেশন, কমপ্লায়েন্সের চাপ হ্রাস, মূলধন ও মুনাফা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং কাস্টমস প্রক্রিয়া সংস্কারের উদ্যোগগুলোকে স্বাগত জানিয়েছে সংগঠনটি। তবে একই সঙ্গে অগ্রাধিকার খাতগুলোতে দীর্ঘমেয়াদি নীতির স্পষ্টতা ও ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়। অ্যামচেমের মতে, নীতির ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজতর হবে।
ডিজিটাল গভর্ন্যান্সের ক্ষেত্রে পিডিপিএ ও এনডিজিএ প্রণয়নকে সাধুবাদ জানিয়ে অ্যামচেম সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহারের উপযুক্ত প্রস্তুতি গ্রহণ, সাইবার নিরাপত্তা জোরদার এবং এই খাতে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে। পাশাপাশি বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির কাঠামোকে একটি কৌশলগত সুযোগ হিসেবে উল্লেখ করে সংগঠনটি জানায়, এই কাঠামো দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও গভীর করার পাশাপাশি বৈশ্বিক মূল্যশৃঙ্খলে বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও সুদৃঢ় করতে পারে। প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল উদ্ভাবন, ক্লাউড প্রযুক্তি, সাইবার নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, উন্নত উৎপাদন এবং আর্থিক খাতের আধুনিকায়নের মতো উদীয়মান খাতগুলোতে সহযোগিতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব আরোপ করা হয়।
ভবিষ্যতের কর্মপরিকল্পনা হিসেবে কর ও কাস্টমস ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও ধারাবাহিকতা রক্ষা, নির্ভরযোগ্য অবকাঠামো ও নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার কথা জানায় অ্যামচেম। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য একটি ‘ডিজিটাল ইকোনমি অ্যাডভাইজরি ফোরাম’ বা টাস্কফোর্স এবং একটি ‘পাবলিক-প্রাইভেট কম্পিটিটিভনেস কাউন্সিল’ গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়। এসব প্ল্যাটফর্মে সরকার, ব্যবসায়ী সমাজ, বিদেশি বিনিয়োগকারী এবং অ্যামচেমের প্রতিনিধিত্ব রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে, যা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে। অ্যামচেম কেবল নীতিগত সুপারিশ দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে দেশের কৌশলগত অংশীদার হিসেবে কাজ করতে আগ্রহী।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অ্যামচেমের দীর্ঘমেয়াদি সম্পৃক্ততাকে স্বাগত জানান এবং বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে সংগঠনটির অবদানের ভূয়সী প্রশংসা করেন। প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশ বর্তমানে অর্থনৈতিক রূপান্তরের একটি নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে এবং দেশে বিনিয়োগের অত্যন্ত অনুকূল ও নিরাপদ পরিবেশ বিরাজ করছে। গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার কার্যক্রমগুলো নিয়মিতভাবে চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার বলে তিনি জানান। নীতির স্পষ্টতা, ধারাবাহিকতা, দক্ষ প্রশাসন এবং ব্যবসায়ীসমাজের সঙ্গে ধারাবাহিক ও গঠনমূলক সংলাপের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের আস্থা আরও সুদৃঢ় করা হবে বলে আশ্বাস দেন প্রধানমন্ত্রী। এছাড়া সম্ভাব্য সব বিদেশি বিনিয়োগকারীকে সরকারের পক্ষ থেকে পূর্ণ সহযোগিতার প্রতিশ্রুতিও পুনর্ব্যক্ত করা হয়।
বৈঠকে সরকারের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন। অ্যামচেমের প্রতিনিধিদলে আরও উপস্থিত ছিলেন সংগঠনটির সহসভাপতি ও মেটলাইফ বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আলা উদ্দিন আহমদ, কোষাধ্যক্ষ ও ফিলিপ মরিস বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রেজা উর রহমান মাহমুদ, এবং নির্বাহী কমিটির অন্যান্য সদস্যবৃন্দ। বৈঠক শেষে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিতব্য ৩০তম ইউএস ট্রেড শোর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগদানের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানায় অ্যামচেম।