বাংলাদেশ ডেস্ক
বর্তমান বিশ্ব ও পরিবর্তনশীল ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় অভিবাসন ব্যবস্থাপনা কেবল অর্থনীতি, কর্মসংস্থান কিংবা শ্রমবাজারের কোনো সাধারণ বিষয় নয়; বরং এটি একটি দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা, সীমান্ত নিরাপত্তা, মানবিক সুরক্ষা এবং সামগ্রিক জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
আজ রাজধানীর মিরপুর সেনানিবাসে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসে (বিইউপি) আয়োজিত ‘মাইগ্রেশন গভর্ন্যান্স অ্যাজ আ ন্যাশনাল সিকিউরিটি ইনস্ট্রুমেন্ট ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক সেমিনারে মূল বক্তার বক্তব্যে এ কথা বলেন প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামছুল ইসলাম। অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মেজর জেনারেল মো. মাহবুব-উল আলম প্রতিরক্ষা উপদেষ্টাকে স্বাগত জানান। সেমিনারে বিইউপির ঊর্ধ্বতন সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা, ডিন, শিক্ষক, গবেষক এবং শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।
মূল বক্তব্যে প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা বলেন, বর্তমান বিশ্বে নিরাপত্তার ধারণা কেবল রাষ্ট্রীয় ভূখণ্ড ও ভৌগোলিক সীমান্ত রক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। মানুষের নিরাপদ চলাচল, বৈধ কর্মসংস্থান, সীমান্ত অতিক্রমের সুশৃঙ্খল প্রক্রিয়া এবং বিদেশে অবস্থানরত নাগরিকদের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষাও এখন জাতীয় নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ। নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও পরিকল্পিত অভিবাসন নিশ্চিত করা না গেলে তা দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা, কার্যকর সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করতে পারে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। এই প্রেক্ষাপটে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা, বৈধ ও নিরাপদ অভিবাসনের সুযোগ সম্প্রসারণ এবং বিদেশগামী নাগরিকদের প্রয়োজনীয় জ্ঞান, প্রশিক্ষণ ও আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে অনিয়মিত অভিবাসন, প্রতারণা, মানব পাচার এবং আন্তর্জাতিক অপরাধচক্রের অবৈধ কার্যক্রম প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সমন্বয় আরও জোরদার করার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি নাগরিকরা দেশের অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার উল্লেখ করে ড. শামছুল ইসলাম বলেন, তাঁদের অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করার পাশাপাশি যেকোনো সংকটকালীন সময়ে দ্রুত সহায়তা প্রদানের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। একটি সুসংহত, মানবিক ও নিরাপত্তা সচেতন অভিবাসন ব্যবস্থাপনা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে ত্বরান্বিত করার পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তাকে আরও সুদৃঢ় করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
অভিবাসনের অর্থনৈতিক, মানবিক, সামাজিক ও নিরাপত্তাগত দিকগুলো সমন্বিতভাবে বিবেচনা করে একটি কার্যকর ও ভবিষ্যৎমুখী নীতিকাঠামো গড়ে তোলার তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে নীতিনির্ধারণী গবেষণা, নির্ভরযোগ্য তথ্যভাণ্ডার, দক্ষ জনবল এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের যৌথ উদ্যোগ বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে।
মূল বক্তব্য উপস্থাপন শেষে একটি উন্মুক্ত ও প্রাণবন্ত মতবিনিময় পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় বিইউপির শিক্ষার্থীরা অভিবাসন নীতি, মানব পাচার প্রতিরোধ, প্রবাসী নাগরিকদের নিরাপত্তা বিধান, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, আঞ্চলিক ভূরাজনীতি এবং জাতীয় নিরাপত্তার বিভিন্ন সমসাময়িক দিক নিয়ে প্রশ্ন করেন। প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা তাঁদের বিভিন্ন প্রশ্নের বিস্তারিত জবাব দেন এবং পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় কার্যকর অভিবাসন ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব ও তাৎপর্য তুলে ধরেন। অনুষ্ঠান শেষে প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা বিইউপির চলমান শিক্ষা, গবেষণা ও উন্নয়নমূলক কার্যক্রমের উচ্চ প্রশংসা করেন এবং জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে গবেষণা, নীতিগত আলোচনা এবং তরুণ প্রজন্মের মধ্যে নিরাপত্তা সচেতনতা তৈরিতে বিশ্ববিদ্যালয়টির অবদান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।