বাংলাদেশ ডেস্ক
বর্তমান বিশ্ব ও পরিবর্তনশীল ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় অভিবাসন ব্যবস্থাপনা কেবল অর্থনীতি, কর্মসংস্থান কিংবা শ্রমবাজারের পরিধির মধ্যে সীমাবদ্ধ কোনো বিষয় নয়। এটি কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা, সীমান্ত নিরাপত্তা, মানবিক সুরক্ষা এবং সামগ্রিক জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। বৃহস্পতিবার রাজধানীর মিরপুর সেনানিবাসে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসে (বিইউপি) আয়োজিত “Migration Governance as a National Security Instrument in Bangladesh” শীর্ষক সেমিনারে মূল বক্তব্য প্রদানকালে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামছুল ইসলাম এই অভিমত ব্যক্ত করেন।
সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে তিনি বলেন, আধুনিক বিশ্বে নিরাপত্তার ধারণায় বহুমুখী পরিবর্তন এসেছে। নিরাপত্তার বিষয়টি এখন কেবল রাষ্ট্রীয় ভূখণ্ড ও ভৌগোলিক সীমান্ত রক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। মানুষের নিরাপদ চলাচল, বৈধ কর্মসংস্থান, সীমান্ত অতিক্রমের সুশৃঙ্খল প্রক্রিয়া এবং বিদেশে অবস্থানরত নাগরিকদের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষা করাও বর্তমান সময়ে জাতীয় নিরাপত্তার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও পরিকল্পিত অভিবাসন নিশ্চিত করা না গেলে তা দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা, সুদৃঢ় সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে নানা ধরনের বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করতে পারে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্সের গুরুত্ব তুলে ধরে প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা বলেন, দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অগ্রগতি বজায় রাখতে প্রবাসীদের অবদান অনস্বীকার্য। তাই দেশের জনশক্তিকে দক্ষ করে গড়ে তোলা, বৈধ ও নিরাপদ অভিবাসনের সুযোগ সম্প্রসারণ এবং বিদেশগামী নাগরিকদের প্রয়োজনীয় জ্ঞান, কারিগরি প্রশিক্ষণ ও আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে অনিয়মিত অভিবাসন রোধ, রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে সংঘটিত প্রতারণা বন্ধ, মানব পাচার প্রতিরোধ এবং আন্তর্জাতিক অপরাধচক্রের অবৈধ কার্যক্রম দমন করতে সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কার্যকর আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় গড়ে তোলা প্রয়োজন।
ড. শামছুল ইসলাম আরও বলেন, বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি নাগরিকরা দেশের অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির এক একজন গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। তাদের শ্রম ও মেধার সঠিক মূল্যায়নের পাশাপাশি বিদেশে তাদের অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা এবং সংকটকালীন সময়ে দ্রুত সহায়তা প্রদানের রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা আরও জোরদার করতে হবে। একটি সুসংহত, মানবিক ও নিরাপত্তা সচেতন অভিবাসন ব্যবস্থাপনা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক গতিশীলতা ত্বরান্বিত করার পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তাকেও বহুগুণ সুদৃঢ় করতে সক্ষম। তিনি অভিবাসনের অর্থনৈতিক, মানবিক, সামাজিক এবং নিরাপত্তাগত দিকগুলো সমন্বিতভাবে বিবেচনা করে একটি কার্যকর ও যুগোপযোগী নীতিকাঠামো গড়ে তোলার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। এক্ষেত্রে নীতিনির্ধারণী গবেষণা পরিচালনা, নির্ভরযোগ্য তথ্যভাণ্ডার তৈরি, দক্ষ জনবল প্রস্তুত এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সমন্বিত উদ্যোগ বিশেষ ভূমিকা পালন করতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
অনুষ্ঠানের শুরুতে প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা বিইউপিতে এসে পৌঁছালে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মেজর জেনারেল মো. মাহবুব-উল আলম তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান। অনুষ্ঠানে বিইউপির ঊর্ধ্বতন সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা, বিভিন্ন অনুষদের ডিন, শিক্ষক, গবেষক এবং শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন। মূল বক্তব্য উপস্থাপন শেষে একটি উন্মুক্ত ও প্রাণবন্ত প্রশ্নোত্তর পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। এ পর্বে শিক্ষার্থীরা অভিবাসন নীতি, মানব পাচার প্রতিরোধ, প্রবাসীদের নিরাপত্তা বিধান, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, আঞ্চলিক ভূরাজনীতি এবং জাতীয় নিরাপত্তার বিভিন্ন জটিল দিক নিয়ে প্রশ্ন করেন। প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা অত্যন্ত ধৈর্যসহকারে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন এবং পরিবর্তিত বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে অভিবাসন ব্যবস্থাপনার কৌশলগত গুরুত্ব তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠান শেষে প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা বিইউপির সার্বিক শিক্ষা, গবেষণা ও প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়নমূলক কার্যক্রমের উচ্চ প্রশংসা করেন। তিনি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিষয়ে গভীর গবেষণা পরিচালনা, নীতিগত আলোচনা আয়োজন এবং দেশের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে নিরাপত্তাসচেতনতা তৈরিতে বিশ্ববিদ্যালয়টির ইতিবাচক অবদান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে বলে দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন।