বাংলাদেশ ডেস্ক
বুধবার রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস ২০২৬’ উপলক্ষে আয়োজিত এক বিশেষ আলোচনা সভায় বক্তারা বাংলাদেশের বৈশ্বিক অবস্থান, পররাষ্ট্রনীতির নতুন রূপরেখা এবং জুলাই আন্দোলনের ঐতিহাসিক গুরুত্ব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ও আলোচকদের বক্তব্যে আন্তর্জাতিক মহলে দেশের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার এবং সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রাখার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। তিনি তার বক্তব্যে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের একটি মন্তব্য তুলে ধরে বলেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ এক সময় তার দৃশ্যমানতা হারাতে বসেছিল, তবে বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দেশটি পুনরায় বিশ্বমঞ্চে নিজের অবস্থান ফিরে পাচ্ছে। এই ইতিবাচক পরিবর্তন আন্তর্জাতিক মিত্রদের মধ্যেও স্বস্তি ও আনন্দের সৃষ্টি করেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম মূল চেতনা ছিল দেশকে কোনো অবস্থাতেই পরনির্ভরশীল রাষ্ট্রে পরিণত না হতে দেওয়া। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শুরু থেকেই ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতিকে সামনে রেখে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করছে। দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং আত্মমর্যাদা ক্ষুণ্ন হয় এমন কোনো আপস ভবিষ্যতে করা হবে না। এই নীতির সফল বাস্তবায়নে দেশের সব নাগরিক ও নীতিনির্ধারকদের যৌথ দায়িত্ব রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলনের ঐতিহাসিক অর্জন ও সাফল্য টিকিয়ে রাখতে সম্মিলিত প্রচেষ্টা অপরিহার্য।
বিগত বছরগুলোর রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সংকটের কথা স্মরণ করে ড. খলিলুর রহমান জানান, বিশেষ করে গত বছরের আগস্টের শুরুর দিকে দেশের উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তিনি গভীরভাবে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলেন। সে সময় জাতিসংঘে কর্মরত তার সাবেক সহকর্মীদের মাধ্যমে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়গুলো আন্তর্জাতিক মহলে জোরালোভাবে তুলে ধরা হয়েছিল। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও জাতিসংঘের নানামুখী তৎপরতা এবং কূটনৈতিক চাপের কারণে সে সময় সংঘটিত সহিংসতা ও গুলিবর্ষণের মাত্রা কিছুটা হ্রাস পেয়েছিল বলে তিনি মন্তব্য করেন। তার মতে, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক উদ্যোগও দেশের সংকট উত্তরণে এবং পরিস্থিতির ইতিবাচক পরিবর্তনে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের ভূ-রাজনীতি এবং কূটনীতিতে যে নতুন ধারার সূচনা হয়েছে, তা দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে পরাশক্তি ও আঞ্চলিক মিত্রদের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে দেশের স্বার্থ রক্ষা করাই বর্তমান কূটনীতির প্রধান চ্যালেঞ্জ। তুরস্কসহ বিভিন্ন বন্ধুভাবাপন্ন দেশের এমন ইতিবাচক মন্তব্য প্রমাণ করে যে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তর ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রক্রিয়াকে সমর্থন করছে।
অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব নজরুল ইসলাম এবং ফরেন সার্ভিস একাডেমির রেক্টর মোহাম্মদ আব্দুল মুহিত। তারা উভয়েই জুলাই অভ্যুত্থানের শহিদদের অবদান শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন এবং একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। বক্তারা প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, সুশাসন এবং কূটনৈতিক ভারসাম্যের ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের যে সম্মানজনক প্রত্যাবর্তন ঘটেছে, তা বজায় রাখতে দেশের অভ্যন্তরীণ ঐক্য সুদৃঢ় করতে হবে।