আইন আদালত ডেস্ক
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) আসন থেকে বিজয়ী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সংসদ সদস্য সরোয়ার আলমগীরের দায়িত্ব পালনে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে করা আবেদন কার্যতালিকা থেকে বাদ দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। সর্বোচ্চ আদালতের এই আদেশের ফলে তাঁর সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন এবং জাতীয় সংসদ অধিবেশনে যোগদানের ক্ষেত্রে আইনগত কোনো বাধা রইল না।
বুধবার (২৯ জুলাই) প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন চার বিচারপতির আপিল বিভাগ এই আদেশ দেন। একই সঙ্গে হাইকোর্ট কর্তৃক সরোয়ার আলমগীরের প্রার্থিতা বৈধ ঘোষণার রায়ের বিরুদ্ধে প্রতিপক্ষ প্রার্থীকে নিয়মিত আপিল দায়ের করার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল। বিজয়ী বিএনপি প্রার্থীর পক্ষে শুনানিতে অংশ নেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন ও আইনজীবী আহসানুল করিম। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির।
মামলার বিবরণ ও সুপ্রিম কোর্টের শুনানির তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, গত মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) চট্টগ্রাম-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী সরোয়ার আলমগীরের প্রার্থিতা বৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের দেওয়া রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত চেয়ে দায়ের করা আবেদনের আদেশের জন্য দিন ধার্য করেছিলেন আপিল বিভাগ। পূর্বনির্ধারিত কার্যসূচি অনুযায়ী বুধবার শুনানি শেষে আদালত নিষেধাজ্ঞা চাওয়ার আবেদনটি নিষ্পত্তি করে তা কার্যতালিকা (কজ লিস্ট) থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানান।
আদালতের আদেশের পর রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান আইনজীবী অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল জানান, আপিল বিভাগ সরোয়ার আলমগীরের সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনে স্থগিতাদেশ না দেওয়ায় তাঁর দৈনন্দিন কার্যাবলি সম্পাদন ও সংসদ অধিবেশনে অংশ নিতে আর কোনো আইনি বাধা থাকছে না। নিয়ম অনুযায়ী নিয়মিত আপিল দায়ের ও তা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত হাইকোর্টের দেওয়া বৈধতার রায় বলবৎ থাকবে।
এর আগে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-২ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দেন সরোয়ার আলমগীর। নম্বরপত্র বাছাই পর্বের প্রথম ধাপে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তা তাঁর আবেদনটি বৈধ বলে ঘোষণা করেছিলেন। তবে প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মুহাম্মদ নুরুল আমিন সরোয়ার আলমগীরের বিরুদ্ধে ঋণখেলাপির অভিযোগ এনে নির্বাচন কমিশনে (ইসি) আপিল দায়ের করেন। আপিল শুনানির পর ১৮ জানুয়ারি নির্বাচন কমিশন সরোয়ার আলমগীরের মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করে।
নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট আবেদন দায়ের করেন সরোয়ার আলমগীর। পরবর্তীতে ব্যাংকিং প্রক্রিয়ায় ঋণ পুনঃতফসিল করার নথিপত্র পর্যালোচনা করে এবং আইনি যুক্তি বিবেচনা নিয়ে হাইকোর্ট নির্বাচন কমিশনের বাতিল আদেশ স্থগিত করেন এবং সরোয়ার আলমগীরের মনোনয়নপত্র বৈধ বলে রায় দেন।
হাইকোর্টের ওই আদেশের বিরুদ্ধে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মুহাম্মদ নুরুল আমিন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল (আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন) করেন। প্রাথমিক শুনানির পর আপিল বিভাগ লিভ মঞ্জুর করেছিলেন এবং নির্বাচন পরবর্তী সময়ে বিষয়টি চূড়ান্ত শুনানির জন্য নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রাখা হয়। পরবর্তী সময়ে গত ৯ জুলাই হাইকোর্ট চূড়ান্ত শুনানি শেষে সরোয়ার আলমগীরের প্রার্থিতা সম্পূর্ণ বৈধ ঘোষণা করে রায় প্রদান করেন।
হাইকোর্টের রায়ের পর নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত ফলাফলের ভিত্তিতে সরোয়ার আলমগীর চট্টগ্রাম-২ আসন থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন। এরপর তিনি জাতীয় সংসদ সচিবালয়ে স্পিকারের কার্যালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ গ্রহণ করেন। নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যকে শপথবাক্য পাঠ করান জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।
তবে সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণের পরও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মুহাম্মদ নুরুল আমিন পুনরায় আপিল বিভাগে আবেদন জানিয়ে হাইকোর্টের রায় স্থগিতের পাশাপাশি সরোয়ার আলমগীরকে সংসদ অধিবেশনে অংশ নেওয়া ও দায়িত্ব পালন থেকে বিরত রাখার অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশনা প্রার্থনা করেন। বুধবার সর্বোচ্চ আদালতের শুনানিতে উক্ত আবেদনটি কার্যতালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্বাচন কেন্দ্রিক এই আইনি প্রক্রিয়ার পর আপিল বিভাগের আজকের সিদ্ধান্ত ফটিকছড়ি সংসদীয় আসনের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কার্যক্রমে স্থিতিশীলতা আনবে। নির্বাচন পরবর্তী সময়ে কোনো সংসদ সদস্যের শপথ এবং সংসদীয় কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার বৈধতা নিয়ে তৈরি হওয়া আইনি অনিশ্চয়তারও অবসান ঘটল এই আদেশের মাধ্যমে। এখন থেকে সরোয়ার আলমগীর পূর্ণাঙ্গ সংসদ সদস্য হিসেবে তাঁর নির্বাচনী এলাকার উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড এবং জাতীয় সংসদের আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখতে পারবেন। তবে মূল বিরোধের বিষয়টি সিভিল আপিল হিসেবে আপিল বিভাগে চূড়ান্ত শুনানির জন্য বিবেচনাধীন থাকবে।