আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইন্দোনেশিয়ার পূর্বাঞ্চল ও উত্তরাঞ্চলে একই দিনে আঘাত হানা দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে ব্যাপক প্রাণহানি ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। গতকাল শনিবার স্থানীয় ভোরে দেশটির পূর্বাঞ্চলে আঘাত হানা রিখটার স্কেলে ৭ দশমিক ৭ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পে এখন পর্যন্ত অন্তত ৪৭ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে দেশটির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ। একই দিন সন্ধ্যায় উত্তর সুমাত্রা প্রদেশে ৬ দশমিক ৪ মাত্রার আরেকটি ভূমিকম্প অনুভূত হয়। উদ্ধার তৎপরতা এখনো চলমান থাকায় হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে স্থানীয় প্রশাসন।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শনিবার ভোরে পূর্বাঞ্চলে হওয়া মূল ভূমিকম্পটির তীব্রতায় বিপুল সংখ্যক ঘরবাড়ি ও সরকারি-বেসরকারি অবকাঠামো ধসে পড়ে। বহু মানুষ ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়েন। দেশটির জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থার প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল সুহারিয়ান্তো জানিয়েছেন, উদ্ধারকারী দলগুলো এখন পর্যন্ত ৪৭টি মরদেহ উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে। নিহতদের অধিকাংশই পূর্বাঞ্চলের সিক্কা, মাঙ্গারাই এবং পূর্ব মাঙ্গারাই এলাকার বাসিন্দা। এ ছাড়া মারাত্মক আহত অবস্থায় অন্তত ৫০ জনকে উদ্ধার করে স্থানীয় বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে, যাদের অনেকের অবস্থাই আশঙ্কাজনক। আরও শতাধিক মানুষ প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছেন।
ভূমিকম্পের পরপরই স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে উপকূলীয় এলাকায় সুনামি সতর্কতা জারি করা হয়েছিল। জনগণকে তাৎক্ষণিকভাবে উপকূল ছেড়ে উঁচু ও নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে পরবর্তী সময়ে ইন্দোনেশিয়ার আবহাওয়া, জলবায়ু ও ভূপ্রকৃতিবিদ্যা সংস্থা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে জানায়, সমুদ্রে কোনো ধরনের অস্বাভাবিক ঢেউ বা বিধ্বংসী জলোচ্ছ্বাসের আলামত পাওয়া যায়নি। ফলে কয়েক ঘণ্টা পর সুনামি সতর্কতা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়, যা উপকূলবাসীর মাঝে সাময়িক স্বস্তি ফিরিয়ে আনে।
প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতির হিসাব অনুযায়ী, ভূমিকম্পের তীব্রতায় অন্তত ১৫৭টি বসতবাড়ি সম্পূর্ণভাবে মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। এ ছাড়া আরও দুই শতাধিক বাড়িঘর ও ভবনে মারাত্মক ফাটল ধরেছে, যা বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর প্রায় দুই হাজার অধিবাসী গৃহহীন হয়ে পড়েছেন। স্থানীয় প্রশাসন এসব বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র এবং জরুরি ত্রাণ শিবিরের ব্যবস্থা করেছে। ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে খাদ্যসামগ্রী, বিশুদ্ধ খাবার পানি, ওষুধ ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা পৌঁছানোর কাজ শুরু হয়েছে।
ভোরের শক্তিশালী কম্পনের ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই শনিবার সন্ধ্যায় দেশটির উত্তর সুমাত্রা প্রদেশে দ্বিতীয় দফায় ৬ দশমিক ৪ মাত্রার আরেকটি ভূমিকম্প আঘাত হানে। ধারাবাহিক এই ভূমিকম্পের কারণে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেকেই আফটারশক বা পরবর্তী কম্পনের আশঙ্কায় খোলা আকাশের নিচে রাত কাটিয়েছেন।
প্রশান্ত মহাসাগরীয় ‘রিং অব ফায়ার’ বা ভূকম্পনপ্রবণ অঞ্চলের ওপর অবস্থিত হওয়ায় ইন্দোনেশিয়ায় নিয়মিত প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত ঘটে থাকে। এই ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ভূগর্ভস্থ টেকটোনিক প্লেটগুলোর নিয়মিত ঘর্ষণে দেশটিতে প্রায়ই বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসে।
বর্তমানে দুর্যোগকবলিত এলাকাগুলোতে উদ্ধারকারী বাহিনী, সেনা সদস্য ও স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকরা যৌথভাবে ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। বিদ্যুৎ ও টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় দুর্গম এলাকাগুলোর সাথে যোগাযোগ স্থাপন করা চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধানে এবং ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো দ্রুত মেরামতে বিশেষ অগ্রাধিকার দিয়ে পুনর্বাসন কার্যক্রমের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।