আন্তর্জাতিক ডেস্ক
গাজা উপত্যকায় স্থায়ী যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠা ও চলমান সংকট সমাধানের লক্ষ্যে মিসরের রাজধানী কায়রোতে দেশটির গোয়েন্দা প্রধান হাসান রাশাদের সঙ্গে বৈঠকে বসেছেন ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতা ও প্রধান আলোচক খলিল আল-হাইয়া। রবিবার (১৬ আগস্ট) সকালে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। জুলাইয়ের শেষ দিকে হামাসের নেতৃত্ব গ্রহণের পর এটিই আল-হাইয়ার প্রথম মিসর সফর। এই বৈঠকের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত নিরসনে মধ্যস্থতাকারীদের নতুন কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে।
মিসরীয় গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে হামাস নেতৃত্বের এই আলোচনায় গাজায় স্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকর, বন্দিবিনিময় এবং মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর বিষয়গুলো প্রধান গুরুত্ব পাচ্ছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গাজা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে তৈরি হওয়া রূপরেখা এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর অবস্থান সমন্বয়ের প্রাথমিক প্রস্তুতি হিসেবেই খলিল আল-হাইয়ার এই সফরকে দেখা হচ্ছে। কূটনৈতিক সূত্রগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা কাটিয়ে নতুন কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে মধ্যস্থতাকারী দেশগুলো সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে।
এদিকে চলমান কূটনৈতিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে আগামী সপ্তাহে মধ্যপ্রাচ্য সফরে আসছেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা ও কূটনীতিক জ্যারেড কুশনার। তিনি মার্কিন প্রশাসনের বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে ইসরাইল ও মিসর সফর করবেন। তার সঙ্গে থাকবেন ‘বোর্ড অব পিস’-এর গাজা বিষয়ক উচ্চ প্রতিনিধি নিকোলাই ম্লাদেনভ। প্রস্তাবিত গাজা পরিকল্পনা নিয়ে ইসরাইল এবং অন্যান্য মধ্যস্থতাকারী পক্ষের মধ্যে বিদ্যমান মতপার্থক্য নিরসন করাই এই সফরের প্রধান লক্ষ্য।
এর আগে আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায় প্রণীত ‘বোর্ড অব পিস’-এর ১৫ দফা শান্তি পরিকল্পনা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ওই পরিকল্পনায় একটি নতুন ফিলিস্তিনি প্রশাসনিক কমিটির কাছে হামাসের অস্ত্র হস্তান্তরের শর্ত অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং হামাসও তাতে প্রাথমিক সম্মতি জানিয়েছিল। তবে ইসরাইলি সরকারের অনড় অবস্থানের কারণে ওই প্রস্তাব বাস্তবায়ন থমকে যায়।
হামাসের রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য বাসেম নাইম বিদ্যমান পরিস্থিতি সম্পর্কে জানান, ইসরাইল সরকারকে প্রস্তাবিত শান্তি পরিকল্পনা মেনে নিতে বাধ্য করার জন্য তারা মধ্যস্থতাকারী রাষ্ট্রসমূহ এবং যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কার্যকর কূটনৈতিক চাপের প্রত্যাশা করছেন। ফিলিস্তিনি নেতৃত্বের দাবি, ইসরাইলি পক্ষের একতরফা অনীহাই শান্তি প্রক্রিয়ার মূল অন্তরায় হিসেবে কাজ করছে।
কূটনৈতিক আলোচনার মধ্যেই গাজা উপত্যকাজুড়ে সামরিক অভিযান ও বিমান হামলা অব্যাহত রেখেছে ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী। স্থানীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্যমতে, শনিবার দিনভর চালানো বিমান হামলা, ভারী গোলাবর্ষণ এবং আবাসিক স্থাপনা ধ্বংসের ঘটনায় অন্তত দুজন ফিলিস্তিনি নিহত এবং ১৪ জন আহত হয়েছেন। ফলে সার্বিক পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত সংঘাতময় ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।
ফিলিস্তিনি সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছরের অক্টোবরে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি প্রক্রিয়া বিঘ্নিত হওয়ার পর থেকে ইসরাইলি অভিযানে এক হাজার ২৫০ জনেরও বেশি ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন। আর ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া সর্বাত্মক সংঘাতে গাজায় নিহতের মোট সংখ্যা ইতোমধ্যে ৭৩ হাজার ৩০০ ছাড়িয়ে গেছে। মানবিক বিপর্যয় ও অবকাঠামোগত ব্যাপক ক্ষতির মুখে কায়রোর এই নতুন বৈঠককে অঞ্চলটিতে শান্তি ফেরানোর গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।