আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যে বিদ্যমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, ইরানের সঙ্গে সামরিক সংঘাত এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে নৌ অবরোধ কার্যকর রাখার প্রেক্ষাপটে ওই অঞ্চলের ছয়টি উপসাগরীয় দেশ ও আরব সাগরে মোতায়েন থাকা মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’ সফর সম্পন্ন করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার। দীর্ঘ দশ দিনের এই কূটনৈতিক ও সামরিক সফরের মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক কৌশল এবং আঞ্চলিক মিত্রদের সঙ্গে ওয়াশিংটনের প্রতিরক্ষা সমন্বয়ের সার্বিক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ডের এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানানো হয়, দশ দিনব্যাপী এই দীর্ঘ সফরে অ্যাডমিরাল কুপার মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, জর্ডান, ইরাক ও ইসরায়েলের শীর্ষ বেসামরিক ও সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে ধারাবাহিক দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন। একই সঙ্গে অঞ্চলজুড়ে মোতায়েন থাকা মার্কিন সেনাসদস্যদের কার্যক্রমও প্রত্যক্ষ করেন তিনি। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বিভিন্ন নিরাপত্তামূলক অভিযানে ৫০ হাজারেরও বেশি মার্কিন সেনা দায়িত্ব পালন করছে। সফরের অংশ হিসেবে জর্ডানে অবস্থিত যৌথ বাহিনীর কমান্ড পরিবর্তনের আনুষ্ঠানিকতায় সভাপতিত্বের পাশাপাশি দায়িত্ব পালনে নিষ্ঠার স্বীকৃতি হিসেবে বেশ কয়েকজন সেনাসদস্যকে পুরস্কৃত করেন সেন্টকম প্রধান।
সফরের অন্যতম প্রধান অংশ ছিল আরব সাগরে অবস্থানরত সান ডিয়েগোভিত্তিক বিমানবাহী রণতরী ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’ পরিদর্শন। চলতি বছরে এটি রণতরীটিতে অ্যাডমিরাল কুপারের দ্বিতীয় দফা পরিদর্শন। সেখানে তিনি রণতরীতে কর্মরত নাবিক ও মেরিন সেনাদের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময় করেন এবং দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার মধ্যেও দায়িত্ব পালনে দৃঢ়তা বজায় রাখার জন্য তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। সেন্টকম প্রধান আব্রাহাম লিংকনের বর্তমান সামরিক অবস্থানকে আধুনিক নৌ-ইতিহাসের অন্যতম তীব্র ও কার্যকর মোতায়েন হিসেবে অভিহিত করেন।
গত বছরের নভেম্বর মাসে নিজ ঘাঁটি ত্যাগ করার পর চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় এসে পৌঁছায় পারমাণবিক শক্তিচালিত এই যুদ্ধজাহাজটি। এরপর থেকে রণতরীটি ইরানের নিরাপত্তা কাঠামোর বিরুদ্ধে পরিচালিত ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’, আঞ্চলিক নিরাপত্তা জোরদারকরণ এবং হরমুজ প্রণালিতে ঘোষিত নৌ অবরোধ কার্যকরে কেন্দ্রীয় প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। সেন্টকমের তথ্যমতে, এই দীর্ঘ সময়ে রণতরীটি থেকে হাজার হাজার যুদ্ধবিমান উড্ডয়ন ও সামরিক অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।
তবে কৌশলগত সাফল্যের পাশাপাশি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে খোদ যুক্তরাষ্ট্রেই ব্যাপক আলোচনা ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। টানা আট মাসেরও বেশি সময় ধরে সমুদ্রে অবস্থান করায় জাহাজের নাবিক ও সেনাদের মধ্যে শারীরিক ক্লান্তি ও তীব্র মানসিক চাপের সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘ সময় কোনো বন্দরে বিরতি ছাড়া মোতায়েন থাকা, পানীয় জলের সংকট ও সীমিত সুযোগ-সুবিধার কারণে সেনাসদস্যদের মনোবল হ্রাস পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে মার্কিন আইনপ্রণেতা ও সেনাদের পরিবারের পক্ষ থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করার পর পেন্টাগন ও মার্কিন নৌবাহিনীর শীর্ষ মহলে পরিস্থিতি মূল্যায়নের তাগিদ তৈরি হয়।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে অঞ্চলটিতে সামরিক ভারসাম্য বজায় রেখে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনকে ফিরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ওয়াশিংটন। লিংকনের স্থলাভিষিক্ত হয়ে দায়িত্ব গ্রহণের উদ্দেশ্যে ইতোমধ্যে আরেকটি পারমাণবিক বিমানবাহী রণতরী ‘ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন’ মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেছে। মার্কিন নৌবাহিনী সূত্রে জানা গেছে, পরিকল্পিত পর্যায়ক্রমিক পরিবর্তনের অংশ হিসেবে লিংকন দ্রুতই যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যাবে। তবে নতুন রণতরীর আগমন এবং পূর্ণাঙ্গ দায়িত্ব হস্তান্তর সম্পন্ন হতে আরও কয়েক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ওয়াশিংটন মধ্যপ্রাচ্যে নৌ আধিপত্য অব্যাহত রাখতে বদ্ধপরিকর। নতুন রণতরী মোতায়েন ও বিদ্যমান সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র যেমন একদিকে ইরানের ওপর সামরিক চাপ বজায় রাখতে চাইছে, তেমনি দীর্ঘ মেয়াদে মোতায়েন থাকা সেনাদের স্বাভাবিক ঘূর্ণন প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার কৌশল গ্রহণ করেছে।