আইন আদালত ডেস্ক
দেশের বিচার ব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের মামলাজট নিরসনে মামলাপূর্ব (প্রি-কেস) বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতা কার্যক্রম অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করছে। এই উদ্যোগ বিচারপ্রার্থীদের দ্রুত ও সহজে বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ সৃষ্টির পাশাপাশি আদালতে নতুন মামলা দায়েরের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনছে।
আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান প্রধান অতিথি হিসেবে রাজধানী ঢাকার আইন মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষ থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে ১০টি জেলায় নতুন করে এই কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। বগুড়া, ঠাকুরগাঁও, পটুয়াখালী, ভোলা, নাটোর, যশোর, শরীয়তপুর, কক্সবাজার, পঞ্চগড় ও টাঙ্গাইল—এই ১০ জেলায় আইনগত সহায়তা প্রদান (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এর ধারা ২১খ-এর বিধান অনুযায়ী এখন থেকে আদালতে মামলা দায়েরের পূর্বে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে মধ্যস্থতার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির উদ্যোগ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এর ফলে উল্লিখিত জেলাগুলোতে ৭টি নির্দিষ্ট আইনের ক্ষেত্রে মামলার জট কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
অনুষ্ঠানে আইনমন্ত্রী জানান, দেশে বর্তমানে প্রায় ৪৫ লাখ মামলা বিচারাধীন রয়েছে, যা বিচার বিভাগের ওপর এক বিশাল চাপ সৃষ্টি করেছে। এই বাস্তবতায় আদালতে মামলা দায়েরের আগেই বিরোধ মীমাংসার সুযোগ তৈরি হলে বিচারপ্রার্থীর সময়, অর্থ ও অপ্রয়োজনীয় ভোগান্তি অনেকাংশে হ্রাস পাবে এবং আদালতের ওপর মামলার চাপ কমবে।
একটি পাইলট প্রকল্পের আওতায় পূর্বে ২০টি জেলায় প্রি-কেস মেডিয়েশন চালুর ফলে অর্জিত সাফল্যের পরিসংখ্যান তুলে ধরে আইনমন্ত্রী জানান, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি-মে সময়ের তুলনামূলক চিত্রে ২০২৬ সালের একই সময়ে বিভিন্ন ক্যাটাগরির মামলা দায়েরের সংখ্যা ব্যাপকভাবে কমেছে। এর মধ্যে পারিবারিক আদালত আইনে মামলা ৫১ শতাংশ, সিভিল জজ আদালতের এখতিয়ারভুক্ত বণ্টন সংক্রান্ত মামলায় ৬৬ দশমিক ৯৭ শতাংশ, স্টেট অ্যাকুইজিশন অ্যান্ড টেন্যান্সি আইনের প্রিম্পশন মামলায় ৮৮ দশমিক ২৪ শতাংশ, নন-এগ্রিকালচারাল টেন্যান্সি আইনে ৫৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ, যৌতুক নিরোধ আইনে ৬৭ দশমিক ৭১ শতাংশ এবং পিতামাতার ভরণ-পোষণ আইনে ১৮ দশমিক ৬০ শতাংশ মামলা হ্রাস পেয়েছে। সার্বিকভাবে এই পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে গড়ে ৬২ দশমিক ০২ শতাংশ মামলা দায়ের কমেছে।
আইনমন্ত্রী বিচারকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, বিচারাধীন মামলাগুলোর মধ্য থেকে যেগুলো আলোচনার মাধ্যমে নিষ্পত্তিযোগ্য, সেগুলোকে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের মাধ্যমে মধ্যস্থতার জন্য প্রেরণ করলে বিচারপ্রক্রিয়া আরও গতিশীল হবে। আদালত, জেলা লিগ্যাল এইড অফিস, আইনজীবী ও সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষ সম্মিলিতভাবে কাজ করলে আগামী এক বছরের মধ্যে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা একটি সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনা সম্ভব হবে।
তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন যে, বর্তমানে কক্সবাজার জেলায় এক লাখের বেশি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এই পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে তিনি জেলার জেলা জজ, বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্টদের আগামী তিন মাসের মধ্যে মামলাজট দৃশ্যমানভাবে হ্রাসের সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ গ্রহণের তাগিদ দেন এবং আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর এর অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হবে বলে জানান। এছাড়া, এই কার্যক্রম বাস্তবায়নে জাইকা (JICA), জিআইজেড (GIZ) এবং ইউএনডিপি (UNDP)-এর সহযোগিতার ভূয়সী প্রশংসা করেন তিনি।
বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোঃ মনজুর হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন আইন ও বিচার বিভাগের সচিব লিয়াকত আলী মোল্লা। এছাড়া ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে বক্তব্য প্রদান করেন যশোরের জেলা ও দায়রা জজ মাহমুদা খাতুন, কক্সবাজারের চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আবু সালেহ মোহাম্মদ নোমান, জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার অভিজিৎ চৌধুরী এবং জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আবদুল মান্নান।